সাঈদ হাসান (ডান থেকে দ্বিতীয়), তাঁর ভাই মোহাম্মদ (মাঝে) ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা
লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর আল-খোখা থেকে যখন ইয়েমেনি সরকারি সেনারা হুতি বিদ্রোহীদের প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটছিল, তখন দ্রুত বাড়ি ফিরে সাঈদ হাসানকে খবরটি দেন তাঁর দুই ছেলে। বিষয়টি শুরুতে স্বাভাবিক ভেবে ছেলেদের আশ্বস্ত করেছিলেন সাঈদ; ধারণা করেছিলেন কৌশলগত কারণেই হয়তো সৈন্যদের সাময়িক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তবে ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ছেলেরা যখন জানান বিপুলসংখ্যক সেনা ঘাঁটি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তখন সাঈদ নিজে গিয়ে দেখতে পান ভারি সামরিক সরঞ্জাম ফেলে সবাই এলাকা ছাড়ছেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি এলাকা ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁর ভাই মোহাম্মদকেও রাজি করান। ভাইপোর মোবাইল ফোনে ধারণ করা সেনাদের পলায়নের দৃশ্য দেখার পর মোহাম্মদেরও সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়।
এর প্রায় এক সপ্তাহ আগে পশ্চিমাঞ্চলীয় হোদেইদাহ ও তাইজ প্রদেশে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র গোলাবর্ষণ ও স্থল অভিযান শুরু করেছিল। ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি বাহিনীর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের মূল ঘাঁটি মোখা থেকে সেনারা সরে গেলে হুতিরা মোখা ও আল-খোখাসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকা কবজায় নেয় এবং পরদিন বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৮ সালে হোদেইদাহ বন্দরের নিকটবর্তী গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া সাঈদ ও মোহাম্মদের পরিবারের কাছে আল-খোখাই ছিল শেষ আশ্রয়। আবারও সংঘাতের মুখে পড়ে নিজেদের টিন ও ত্রিপলের ঘর ফেলে তাঁদের পালাতে হয়; পরে জানা যায় স্থানীয়রা তাঁদের সেই ঘর খুলে নিয়ে গেছে এবং মালপত্র লুট করেছে।
তাঁদের সঙ্গে কোনো সুপেয় পানি ছিল না এবং পথিমধ্যে প্রায় সব দোকানই বন্ধ পাওয়া যায়। কাপড়ের ব্যবসা করা মোহাম্মদ বিপুল পরিমাণ পণ্য ফেলে শুধু কিছু জরুরি কাগজ ও হালকা জিনিসপত্র নিয়ে মোখায় গিয়ে পরদিন ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু হুতিদের দ্রুতগতির অগ্রযাত্রায় তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাঈদ তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই পুত্রবধূ, মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে একটি ছোট পিকআপে ওঠেন। অন্য গাড়িতে স্ত্রী ও এক আত্মীয়কে নিয়ে রওয়ানা হন মোহাম্মদ; সঙ্গে তুলে নেন পলায়নরত তিন সেনাসদস্যকেও। পথে দেখা যায়, হুতিদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে সেনারা সামরিক পোশাক খুলে বালুর নিচে অস্ত্র লুকিয়ে রাখছিলেন কিংবা ফেলে পালাচ্ছিলেন; এমনকি একটিও গোলা না ছোড়া সম্পূর্ণ নতুন কামানও রাস্তায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
যাত্রাপথে মোহাম্মদের গাড়ির টায়ার ফেটে গিয়ে উল্টে যাওয়ার উপক্রম হলে তিনি পূর্বে নষ্ট হওয়া একটি অতিরিক্ত চাকা লাগিয়ে নেন। বিপদের ঝুঁকি এড়াতে সাঈদ তাঁর দল নিয়ে এগিয়ে যান। রাত বারোটার দিকে জনশূন্য মোখায় পৌঁছে সাঈদ দেখতে পান, পিছু হটা সেনাদের গাড়িবহর না থেমে সরাসরি এডেনের দিকে ছুটছে। রাস্তায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত সৈন্যদের মরদেহ এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গোলাবারুদের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে তাঁরা কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান। এদিকে মোহাম্মদ পরদিন সকালে থুবাব পেরিয়ে রাস আল-আরা যাওয়ার পথে বিকল্প টায়ারটিও নষ্ট হয়ে যায়। নির্ঘুম ও তৃষ্ণার্ত মোহাম্মদ টায়ার কাঁধে নিয়ে মেরামতের জন্য বেলা তিনটা পর্যন্ত চেষ্টা চালান। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর স্ত্রী তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি চাইলে এক পথচারী গাড়ি থামিয়ে সামান্য পানি দিয়ে চলে যান। পরে এক সেনা সদস্য তাঁদের খাবার পানির ব্যবস্থা করে দেন। সে সময় কিছু সেনাকে ৫০০ সৌদি রিয়ালে নিজেদের রাইফেল বিক্রি করতেও দেখা যায়।
১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এডেন পৌঁছান সাঈদ এবং সেখানে বাস্তুচ্যুতদের একটি অস্থায়ী স্কুলক্যাম্পের বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান, কারণ শ্রেণিকক্ষে কেবল নারীদের থাকার সুযোগ ছিল। মোহাম্মদ এডেন পৌঁছান পরদিন। আশ্চর্যজনকভাবে, জ্বালানি প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আল-খোখা থেকে এডেন পর্যন্ত পুরো ৩০০ কিলোমিটার পথ কোনো বাড়তি তেল ছাড়াই গাড়ি দুটি অতিক্রম করে। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর এডেন ছেড়ে আবইয়ান প্রদেশের লাওদারে এক আত্মীয়ের কাছে দুই দিন জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করেন তাঁরা। ১৪ সেপ্টেম্বর মুকাল্লার উদ্দেশে ফের যাত্রা শুরু করলে পরদিন শাবওয়া প্রদেশের হুরায় সাঈদের গাড়ি বিকল হয়, যা এক স্থানীয় মেকানিককে ঘুম থেকে ডেকে ঠিক করা হয়। অবশেষে গৃহত্যাগের ঠিক সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁরা মুকাল্লায় পৌঁছাতে সক্ষম হন।
বর্তমানে মুকাল্লায় প্রতি মাসে ৪০০ সৌদি রিয়াল ভাড়ায় তিন কক্ষের একটি বাসা নিয়েছেন দুই ভাই; জামানত হিসেবে আরও ৪০০ এবং মধ্যস্থতাকারীকে ২০০ রিয়াল গুনতে হয়েছে। কাজ না মেলায় এবং সঞ্চয় ফুরিয়ে আসায় টাকা বাঁচাতে সকালের খাবার বাদ দিচ্ছেন মোহাম্মদ। ইয়েমেনের বাস্তুচ্যুত ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ আওয়াদ জানান, অনেকেই শুধু পরনের কাপড় নিয়ে পৌঁছাচ্ছেন, যাঁদের মধ্যে অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীরাও আছেন। এদিকে সরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯০৬ জন বা ২৯ হাজার ৫১৯টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে, যার বড় অংশই তাইজ অঞ্চলের। এর মধ্যেই মোহাম্মদের স্ত্রী ফাতিমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া ১ কোটি ২০ লাখ ইয়েমেনি রিয়ালের দেনা; কোনোমতে ঋণ পরিশোধ করে তবেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।