advertisement
advertisement

মব জাস্টিস ও আইনের শাসন: আমরা কি বিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি?


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ
মব জাস্টিস ও আইনের শাসন: আমরা কি বিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি?

শিল্পীর চোখে মব জাস্টিস

advertisement

একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার আইনের শাসন এবং নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজকাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাকালে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার বদলে যখন রাস্তার উন্মত্ত জনতার হুংকারই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গত ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ক্যাম্পাসে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসা অবক্ষয়, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অসহিষ্ণুতার এক ভয়াবহ উপসর্গ। ফেসবুকে একটি নিছক মন্তব্যের জেরে নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কটূক্তির ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে যেভাবে একদল শিক্ষার্থী একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে ক্যাম্পাসে মব হামলা বা গণপিটুনির পরিস্থিতি তৈরি করল, তা সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম অশনিসংকেত। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যাকে বলা হয় মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ তীর্থস্থান সেখানে যখন যুক্তির বদলে অন্ধকারের উন্মত্ততা রাজত্ব করে, তখন বুঝতে হবে একটি জাতি হিসেবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য চরম আকার ধারণ করেছে।

গুজবের মনস্তত্ত্ব এবং মব জাস্টিসের উত্থান

আধুনিক বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, 'ধর্মানুভূতিতে আঘাত' বা 'ধর্ম অবমাননা' শব্দগুলো বর্তমানে এক প্রকার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সমাজের প্রচলিত কুসংস্কারের সমালোচনা, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক শত্রুতা হাসিলের সহজ মাধ্যম হিসেবে সুপরিকল্পিতভাবে এই ধরনের গুজব রটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটি খণ্ডিত স্ক্রিনশট, একটি এডিট করা ভিডিও বা একটি বানোয়াট অভিযোগই আজ একটি মানুষের জীবন বিপন্ন করার জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মব জাস্টিস বা উন্মত্ত জনতার গণপিটুনির একটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্ন রয়েছে। যখন একটি বড় গোষ্ঠী ধর্মের নামে বা গুজবের বশবর্তী হয়ে কাউকে আক্রমণ করার জন্য একত্রিত হয়, তখন সেখানে মানুষের নিজস্ব বিবেক, যুক্তি বা বিচারবুদ্ধি কাজ করে না। মবের কোনো নির্দিষ্ট মুখাবয়ব বা দায়বদ্ধতা থাকে না। তারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে এবং সমাজের স্বঘোষিত রক্ষক বলে মনে করতে শুরু করে। তারা ভুলে যায় যে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বিচার করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ও আদালত রয়েছে। বুটেক্সের মতো দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা যখন সামান্য একটি গুজবের ওপর ভিত্তি করে একজন সহপাঠীর রক্ত নেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে, তখন আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আমরা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পড়াচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের মনোজগতে পরমতসহিষ্ণুতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে কাঠামোগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছি।

ক্ষমতার শূন্যস্থান ও আইনের শাসনের দুর্বলতা

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার ওপর ধারাবাহিক আঘাত লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পনেরো বছরের সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়, তার সুযোগ নিয়েছে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ও উগ্র গোষ্ঠী। ক্ষমতার এই পালাবদলের পর দেশে আইনের শাসনের যে সাময়িক দুর্বলতা দেখা দেয়, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যে মাত্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপর। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই সারা দেশে গণপিটুনির ঘটনায় ১২৮ জন মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। এটি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি আইনের শাসনের চরম ব্যর্থতার দলিল। আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী মনে করছে তারা রাস্তার জোরে যেকোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারে। মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ, পোশাক, শিল্পকলা বা বিজ্ঞানমনস্কতার ওপর তারা নিজেদের ফতোয়া জারি করছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের নিষ্ক্রিয়তা বা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন এই মব সন্ত্রাসকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছে।

শিক্ষাক্রম, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সাংস্কৃতিক মেরুকরণ

একটি সমাজ যখন সামনের দিকে এগোতে চায়, তখন সবার আগে তার শিক্ষাব্যবস্থা ও মুক্তচিন্তার পথকে প্রসারিত করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, বিজ্ঞান ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার চলছে। ২০২৪ সালের শুরুতে জাতীয় শিক্ষাক্রমের সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে 'শরীফ থেকে শরীফা' নামক একটি গল্পের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যে জাতীয় বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল, তা এর একটি বড় উদাহরণ। ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক সচেতনতা ও সহানুভূতি তৈরির একটি মানবিক উদ্যোগকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়। একইসাথে তৃণমূল পর্যায়ে যারা কিশোর-তরুণদের মাঝে বিজ্ঞান, মানব বিবর্তনবাদ বা যুক্তিশাস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিজ্ঞান ক্লাব বা পাঠচক্রের মতো উদ্যোগ নিচ্ছেন, তাদের ওপর প্রতিনিয়ত মানসিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে পহেলা বৈশাখ বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলোকে ভিনদেশি বা ধর্মবিরোধী তকমা দিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। এই প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সমাজ থেকে বৈচিত্র্য, প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তাকে মুছে ফেলে একটি একরৈখিক ও অসহিষ্ণু ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়।

‘ধর্মানুভূতি’র রাজনৈতিক ব্যবহার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

আমাদের সমাজে 'ধর্মানুভূতি' নামক স্পর্শকাতর বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো এত দুর্বল হতে পারে না যে তা অন্যের ভিন্নমত বা আলোচনায় ভেঙে পড়বে। মূলত এই ধর্মানুভূতির ধুঁয়ো তুলে ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দেওয়ার একটি নীরব ও সরব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। যখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মত প্রকাশের টুঁটি চেপে ধরা হয় বা কালো আইনের ভয় দেখানো হয়, তখন সমাজের ভেতরে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা জন্ম নেয়। বুটেক্সের ঘটনায় আমরা দেখেছি কীভাবে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে মব তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে কারণ এর পেছনে রয়েছে বিচারহীনতার এক দীর্ঘ সংস্কৃতি। যারা মব তৈরি করে বা গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যা করে, তারা জানে যে তাদের কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে না। বড়জোর কিছুদিন আলোচনা হবে, এরপর নতুন কোনো ঘটনায় পুরনোটি ধামাচাপা পড়ে যাবে। বিচারহীনতার এই নিশ্চয়তাই একজন সাধারণ মানুষকে জল্লাদে পরিণত হতে উৎসাহিত করে।

রাষ্ট্রের করণীয় ও আইনি কাঠামোর প্রয়োগ

একটি আধুনিক রাষ্ট্রে আস্তিক, নাস্তিক, সংশয়বাদী—সবারই সমান আইনি অধিকার রয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার, যা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ফতোয়া বা মবের হুমকির ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। এই ভয়াবহ মব সংস্কৃতির হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বপ্রথম, মব জাস্টিস বা গণপিটুনির সাথে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তিকে, সে যেই হোক না কেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশকে আগাম ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল মুখস্থবিদ্যা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পরমতসহিষ্ণুতা, যুক্তি খণ্ডন এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে। সর্বোপরি, গুজব এবং মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে।

উপসংহার

বুটেক্সের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, অসহিষ্ণুতার আগুন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। আমরা যদি এখনই এই মব জাস্টিস এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরতে না পারি, তবে আগামী দিনে এটি একটি ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। সমাজকে অন্ধকারের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ এবং আইনের শাসনের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে দেশ পরিচালিত হয় সংবিধান ও আইনের দ্বারা, রাস্তার উন্মত্ত জনতার পেশিশক্তি বা গুজবের দ্বারা নয়। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্রযন্ত্র এবং নাগরিক সমাজকে এই বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: হামিম সা আদ মাহমুদ

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর