কেউ যদি চান ছেলেকে না দিয়ে, মেয়েকে বেশি সম্পত্তি দেবেন সেটিও সহজ হচ্ছে আইনের এই ধারায়। ছবি: এআই
আমার পরিচিত এক নারী রাজশাহীতে থাকেন। তাঁরা দুই বোন। সেদিন সকালেই
পত্রিকায় তিনি পড়েছেন জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীর
খুঁটিনাঁটি। পড়েছেন এ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের ব্যাখ্যা।
সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা
পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের
সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
৭ সেপ্টেম্বর সম্পত্তি হস্তান্তর–সংক্রান্ত
‘১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ পাস হয়।
সদ্য কর্মজীবনে ঢোকা এই নারীর এরই মধ্যে
সম্পত্তি নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘আমাদের কোনো
ভাই নেই। এ কারণে আমার বাবা আমার ও আমার বোনদের নামে হেবা (জীবদ্দশায় কাউকে
বিনামূল্যে নিজের সম্পত্তি হস্তান্তর) করেছেন। তবে আমার বাবার এ সিদ্ধান্তে মোটেও
খুশি নন আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা। এমনকি সম্পত্তি দিয়ে দিলে মেয়েরা পরে আর মা–বাবাকে
দেখবে না, স্বজনেরা এমন ভয় দেখাচ্ছেন। এতে বাবাও কিছুটা উদ্বিগ্ন।’
এই নারীর প্রশ্ন, ‘কন্যা সন্তানের পিতা-মাতার কেবল সম্পত্তিরই
ভাগীদার আছে, তাদের সেবা করার ভাগীদাররা কোথায়? যদি কন্যা সন্তানের বাবা-মা কোনো
ঋণ রেখে মারা যান তখন সেই ঋণের বোঝা কি আত্মীয়-স্বজন নেবেন? নাকি তা টানার দায়িত্ব
কেবল কন্যাদেরই? তাহলে সেবা করবে মেয়েরা, ঋণের বোঝা টানবে মেয়েরা কিন্তু সম্পদের
ভাগীদার হবে আত্মীয়-স্বজন?’
হেবা করা হলেও সম্পত্তি ঠিকঠাক বুঝে পাবেন
কি না তা নিয়ে চিন্তায় আছেন এই নারী। তবে অনলাইনে, টিভিতে, পত্রিকার খবরে সম্পত্তি
হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাস হওয়ার খবরে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
তাঁর মনে হয়েছে এতে মা–বাবাও স্বস্তি পাবেন।
মেয়েদের সম্পত্তি দান করলেও ভোগের অধিকার থাকবে। আবার আইন হওয়ায় আত্মীয়স্বজনেরাও
জোর করতে পারবেন না।
এটা মন্দের ভালো বলে তিনি মনে করেন। তবে
তিনি চান রাষ্ট্র এমন আইন করুক যেখানে কন্যাসন্তান তাঁদের প্রাপ্য সহজে পেতে পারে।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ধর্মীয়
সংগঠন ও ব্যক্তি আইনের সংশোধনীর বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা বলছেন এটি শরিয়তসম্মত নয়।
এটি প্রত্যাহার না করলে আন্দোলন জোরদার করা
হবে বলেছে বিরোধী দল। বাবা-মার নিরাপত্তার চিন্তা থেকেই তাঁদের জন্য এই আইনটা করা
হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত
সাক্ষাৎকারে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই সমাজে বাবা-মা অসহায় হয়ে যাচ্ছেন শেষ বয়সে।
সম্পত্তি ছেলেমেয়েরা লিখে নিলেও বাবা-মাকে
বের করে দেওয়া হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রেই আইনটি
প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। কেউ যদি তাঁর ধর্ম অনুসারে চলতে চান, সেখানে
আইন বাধা হবে না।
এটা যাঁর ইচ্ছা করতে পারবেন। এই আইনকে একটা
অপশন হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রী আরও বলছেন, আইনের ১২২ (এ)-এর চার
ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, শুধু হেবা না, অন্য ধর্মের যে পারসোনাল ল আছে
সেটি সুরক্ষিত থাকবে।
জামায়াতপন্থী আইনজীবী শিশির মনিরও এই আইনকে
ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেন না বলে ওই সাক্ষাৎকারে জানান মন্ত্রী।
সম্পত্তির ভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন
রাজধানীর কলাবাগানের বাসিন্দা ফারুক আহমেদ (ছদ্মনাম)। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই
বাবা জানান, তাঁর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেরা সুপ্রতিষ্ঠিত। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে।
মেয়েদের একজন স্বল্প বেতনের চাকরি করেন। আরেকজন গৃহিনী।
এ অবস্থায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কিছুটা বেশি
সম্পদ দিতে চান এই বাবা। ভেবেছিলেন উইল করবেন। তবে এক ধরনের আশঙ্কাও ছিল। মেয়ের
জামাইরা যদি পরে তাঁকে আর না দেখে! সময়ের সাথে সাথে মেয়েরাও যদি বদলে যায়!
বোনদের বেশি সম্পদ দিলে, ভাইরাও যদি নাখোশ
হয়ে মা–বাবাকে না দেখে! সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাসের খবরে এতসব
দুশ্চিন্তার অনেকটাই কমেছে।
এখন এই বাবা ভাবছেন, মেয়েদের কিছু বেশি
সম্পত্তি তিনি দান হিসেবে দিতে পারবেন। আবার জীবদ্দশায় তাঁর ভোগেরও অধিকার থাকবে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কমবে। এটি তাঁর কাছে অনেক গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে।
এবার বলি, এক মায়ের শঙ্কা ও তাঁর মেয়ের
বঞ্চনার কথা। কেউই নামপ্রকাশে রাজি হননি। ঘটনাটি বেশ কয়েক বছর আগের। রংপুরে এক
ব্যক্তির দুই স্ত্রী ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর ছেলেসন্তান রয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর
একটিমাত্র মেয়ে।
ওই ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তাঁর দ্বিতীয়
স্ত্রীকে কিছু সম্পত্তি দিয়ে যান। তাঁর ছেলেরা আপত্তি করেননি। তবে এই মায়ের আশঙ্কা
ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তি মেয়ে ভোগ করতে পারবে কি না। তাঁর সেই আশঙ্কা সত্যিও
হয়।
মৃত্যুর পর মেয়েটির মামারা সম্পত্তি দাবি
করে বসলেন। মেয়েটি সম্পত্তির যে অংশটুকু প্রাপ্য ছিল তাও পেল না।
যদি সে সময় সম্পত্তি আইন পাস হতো তাহলে এই
মা কী করতে পারতেন? তিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই মেয়েকে সম্পত্তি দান করতে পারতেন। আবার
ভোগও করতে পারতেন।
এই বিষয় নিয়ে কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীনের সঙ্গে। তিনি বললেন, মা–বাবা চাইলে
ছেলে মেয়েকে সম্পত্তি লিখে দিতে পারেন।
তবে উদ্বেগের বিষয়টা হলো, সন্তান ভবিষ্যতে
তাঁর ভরণপোষণ করবে কি না। ধরা যাক, কোনো মা মেয়েকে বাড়ি লিখে দিলেন।
পরে মেয়ে বা তাঁর পরিবার তাঁকে বাড়ি থেকে
উচ্ছেদও করতে পারে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের নতুন ধারায় সেই আশঙ্কা কম থাকছে।
মা–বাবা জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ করতে
পারছেন। তাঁদের নিরাপত্তা থাকছে। আবার সন্তানের উত্তরাধিকারও তাঁরা নিশ্চিত করতে
পারছেন।
শুরুতে রাজশাহীর যে নারীর কথা বলেছিলাম, সেই
ঘটনারই ছাপ পাওয়া যায় ঢাকার মিরপুরের এক নারীর সঙ্গে আলাপে। নামপ্রকাশ না করার
শর্তে জানালেন দুই প্রজন্মের হতাশার গল্প।
২০০৩ সালে বাবাকে হারান তিনি। তিনবোন তাঁরা।
তখন পড়াশোনা করছেন। বাবা হেবা করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে বাবার সম্পত্তি
ভাগ হয়ে যাবে চাচা আর চাচাতো ভাইদের সঙ্গে। তবে চাচারা এই তিন বোনকে তাঁদের
প্রাপ্য অংশটুকু দিতে নারাজ ছিলেন।
সেই অল্প বয়সে জমিজমা সংক্রান্ত আইন, দলিল
তেমন কিছুই বুঝতেন না। ফলে নিজেদের অংশ পেতে নামজারি, রেজিস্ট্রি করতে এই আইনজীবী,
সেই আইনজীবীর কাছে ঘুরেছেন।
এমনকি একটা সময়ে তাদের বাড়ি থেকে উৎখাতেরও
চেষ্টা করেন চাচারা। শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় মিটিয়ে নেন এই তিন বোন। তবে সে জন্য
নিজেদের প্রাপ্য অংশের অনেকটা ছেড়ে দিতে হয়।
একই ঘটনা ঘটেছে তাঁর মা–খালার সঙ্গে।
নানা–নানি মারা যাওয়ার পর ভাইয়েরা বোনদের প্রাপ্য অংশ দিতে চাননি। পেতে হলে যেতে
হবে আইনি ঝামেলায়। তাই তাঁরাও বেছে নিয়েছেন কিছুটা সমঝোতার পথ। যাতে আছে অনেকটা
ছাড়।
মিরপুরের এই নারী জানালেন, নারীরা এভাবে
প্রজন্মের পর প্রজন্মে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। নিজের বা
চাচাতো–মামাতো ভাইরা তাঁদের সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ দিতে চান না।
আবার স্বামীর বাড়িতেও সম্পত্তির ভাগ যথাযথ
হয় না। জমি, আইন, সম্পদ সংক্রান্ত বিষয়ে নারীদের পারিবারিকভাবেই কম অন্তর্ভুক্ত
করা হয়। ফলে তাঁদের এ নিয়ে জ্ঞানও কম থাকে। আর এই অজ্ঞানতাই তাঁদের দুর্বলতা হয়ে
ওঠে।
তিনি মনে করেন, আইন পাসই যথেষ্ট নয়।
সহিংসতা, নির্যাতনের ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য যেমন হেল্পলাইন ৯৯৯ আছে সে রকম কোনো
একটা প্ল্যাটফর্ম থাকা দরকার সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে।
যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা তাঁদের অভিযোগ
জানাতে পারবেন। বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ পাবেন।
স্কুল, কলেজে এ বিষয়ে পড়ানো যেতে পারে বলে
মনে করেন এই নারী। শিক্ষিত ও চাকরিজীবী নারীরাই যখন এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তখন
নিম্নবিত্তদের পরিস্থিতি কী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ঢাকার এক গৃহকর্মী রহিমারা (ছদ্মনাম) চার
বোন। থাকেন পশ্চিম রাজাবাজারে। জানতে চাইলাম, বাবার সম্পত্তি পেয়েছেন কি না। উত্তর
যা এল তাতে বোঝা যায়, আর অধিকার কি, ওসব তো চাচারা খেয়ে নিয়েছে।
আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে কি না জানতে চাইলে
রহিমা বলেন, ‘কোর্ট কাচারিতে টেহা লাগে ম্যালা’। রহিমা তাই চেষ্টা করেন নিজে কাজ
করে ভালো থাকার। তাঁরও তিন মেয়ে। তাঁদের সম্পতি পাওয়ার কী হবে তা জানেন না রহিমা।
আপাতত তাঁদের ভালো বিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় আছেন।
কী সহজ হলো
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের নতুন ধারা নারীদের
ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা দিতে পারে তা নিয়ে কথা বললেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
আইন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান মামুন। তিনি বলেন, ধরা যাক কারও দুই
মেয়ে।
আইনের এই নতুন ধারায় তিনি যেকোনো সময় পুরো
সম্পত্তি তাঁর দুই মেয়েকে দান করে দিতে পারবেন। আবার সেই সম্পত্তির মধ্যে যদি
পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমি থাকে তাহলে তা ভোগও করতে পারবেন আমৃত্যু।
উইল করতে হলে তিনি দিতে পারতেন তিন
ভাগের এক ভাগ। আর হেবা করলে সঙ্গে সঙ্গেই সেটি দানগ্রহীতার কাছে চলে যেত। এই আইন
মেয়েদের প্রাপ্য সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্র সহজ করল।
আইনের শিক্ষক মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, কেউ
যদি চান ছেলেকে না দিয়ে, তিনি মেয়েকে বেশি সম্পত্তি দেবেন সেটিও সহজ হচ্ছে আইনের
এই ধারায়। এতে পারিবারিক জটিলতাও কমবে বলে তিনি মানে করেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন,
গ্রামে দেখেছেন কেউ যদি ছেলেকে কম দিয়ে মেয়েকে বেশি সম্পত্তি দেন তাহলে ছেলে আর
মা–বাবার ভরণপোষণ করে না। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ারও ঘটনা ঘটে।
এ ক্ষেত্রে যেহেতু মা–বাবা জীবদ্দশায় সম্পদ
ভোগ করতে পারছেন তাহলে পারিবারিক মামলা, ঝামেলাও কমবে। হেবা যেহেতু সুরক্ষিত থাকছে
তাই সংশোধিত আইন মুসলিম পারিবারিক আইনে কোনো সমস্যা হবে বলে তিনি মনে করেন না।
· শুভা জিনিয়া চৌধুরী সাংবাদিক
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।