advertisement
advertisement

উৎপাদন তলানিতে, গ্যাস সংকটে ধুঁকছে দেশের সিরামিক খাত


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ
উৎপাদন তলানিতে, গ্যাস সংকটে ধুঁকছে দেশের সিরামিক খাত

সিরামিক কারখানার প্রতীকী। ছবি: সংগৃহীত

advertisement

দীর্ঘায়িত গ্যাস সংকটে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সিরামিক শিল্প আজ খাদের কিনারে। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, আর কিছু চলছে অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায়। খাতসংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, গাজীপুর, সাভার, ধামরাই, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ দেশের প্রধান শিল্প এলাকাগুলোর অন্তত ৩০টি টাইলস, সিরামিক ও স্যানিটারিওয়্যার কারখানায় এই তীব্র সংকট বিরাজ করছে।

সংকটের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক মাত্রা:

সিরামিক কারখানার চুল্লিগুলো সার্বক্ষণিক সচল রাখতে প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ১৫ পাউন্ড (পিএসআই) গ্যাস চাপ প্রয়োজন। কিন্তু গত এক মাস ধরে এই চাপ ৩–৪ পিএসআই এমনকি শূন্যে নেমে আসছে। ফলে অনেক কারখানা ৩৪–৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে এবং সার্বিক সিরামিক উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩৫ শতাংশে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) মতে, মোট উৎপাদন খরচের ১২ শতাংশ যায় গ্যাসের পেছনে। চুল্লিতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পেলে ভেতরের পণ্য নষ্ট হয়। এছাড়া একবার চুল্লি বন্ধ হলে তা পুনরায় চালু করতে ৪৮-৭২ ঘণ্টা সময় লাগে। বিসিএমইএ-এর সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিন বলেন, “পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কারখানাগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়বে। এছাড়া স্থানীয় উৎপাদন কমে গেলে পণ্য আমদানির পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে।”

ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন ও রপ্তানি:

  • আর্টিসান সিরামিকস: গাজীপুরে অবস্থিত ও ইউরোপে টেবিলওয়্যার রপ্তানিকারী এই কারখানার উৎপাদন ৩৫ শতাংশ কমেছে। দৈনিক ৭ টন সক্ষমতার কারখানাটি বিকল্প হিসেবে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিলেও লোডশেডিংয়ের মুখে পড়েছে। সিইও মামুনুর রশিদ বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ ৩৫–৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।” তিনি আক্ষেপ করে জানান, “গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানিও প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ কমে গেছে। বাধ্য হয়ে আমাদের অর্ডার নেওয়ার পরিমাণও কমাতে হয়েছে। এতে ক্রেতারা হতাশ হচ্ছেন। আগামী বছর তারা আমাদের ক্রয়াদেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।”
  • গ্রেট ওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ: গাজীপুরের শ্রীপুরে তাদের টাইলস কারখানা এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকায় দৈনিক ৪০ হাজার বর্গমিটার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং শ্রমিকরা ছুটিতে আছেন। হবিগঞ্জে তাদের স্যানিটারিওয়্যার কারখানার (মাসিক সক্ষমতা ১ লাখ কমোড/বেসিন) উৎপাদন ৩৫ শতাংশ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, তারা সাধারণত এক-দেড় মাসের মজুত রাখেন। তাঁর কথায়, “গ্যাস সংকটে প্রায় এক মাস ধরে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আমরা বাজারের চাহিদা মেটাতে পারছি না, বিক্রিও ইতিমধ্যে কমে গেছে। আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
  • আরএকে ও মীর সিরামিকস: গ্যাস সংকটে আরএকে সিরামিকসের ৪টি ইউনিট টানা ৮ দিন বন্ধ থাকার পর শুক্রবার একটি চালু হয়েছে, যা সক্ষমতার ২৫ শতাংশ। সিইও মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো হয়নি। অন্যদিকে, শ্রীপুরে মীর সিরামিকসের ৪টি ইউনিটের ৩টিই ১৭ দিন ধরে বন্ধ। ৮০০ শ্রমিকের বেশিরভাগ ছুটিতে। দৈনিক ৩ লাখ বর্গফুটের উৎপাদন নেমেছে মাত্র ৫০ হাজারে। এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান গ্যাস চাপে কেবল একটি ইউনিটই চালানো সম্ভব হচ্ছে।
  • মেঘনা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ: সোনারগাঁয়ের আষাড়িরচরে অবস্থিত কারখানার সিওও একেএম জিয়াউল ইসলাম জানান, দৈনিক ৫১ হাজার বর্গমিটার উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটে তারা বাজারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন।

শিল্পের সার্বিক চিত্র ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা:

বিসিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট ৭৬টি সিরামিক কারখানা (টেবিলওয়্যার, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও ইট) রয়েছে, যার মধ্যে ৩১টি টাইলস। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় টাইলস বাজারের আকার ছিল ৫,৮৫৪ কোটি টাকা (যার ৮২ শতাংশ দেশীয় উৎপাদকদের) এবং পুরো সিরামিক খাতের বাজার ছিল ৮,২৫০ কোটি টাকা। এ খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং ৫ লাখ কর্মসংস্থান রয়েছে। কারখানাগুলো মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ভোলায় অবস্থিত।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলা ও হবিগঞ্জের ৭-৮টি কারখানা বাদে বাকি সব ক্ষতিগ্রস্ত। সংকটে থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে সাভার, ধামরাই, রূপগঞ্জ, মেঘনাঘাট, কাশিমপুর, ভবানীপুর, ভাওয়াল মির্জাপুর, শ্রীপুর, মাওনা, পাঁচদোনা, ভালুকা, ত্রিশাল, মাধবপুর ও বাহুবল অন্যতম। শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, এসব কারখানা ২০–৩০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।

বিসিএমইএ সভাপতি মইনুল ইসলাম জানান, ভোলা ও হবিগঞ্জের বাইরের কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অভ ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রতিনিধিরা সম্প্রতি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মইনুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “যে খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, সেখানে উৎপাদনকারীরা এখন আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘায়িত এই গ্যাস সংকট সাময়িক উৎপাদন বিপর্যয়কে আরও গভীর শিল্প ও কর্মসংস্থান সংকটে রূপ দিতে পারে।”

 

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর