advertisement
advertisement

ইরান যুদ্ধ ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান যুদ্ধ ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান সদর দপ্তরের কাছে ধোঁয়া উঠছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ছবি: এএফপি

advertisement

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার বধিব পরান’।

ফরাসি সমর নায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বাংলা জানতেন না, তাই তিনি কথাটা একটু ভিন্নভাবে বলেছেন, ‘একই শত্রুর সঙ্গে তোমার বারবার লড়াই করা উচিত নয়; তাহলে সে তোমার যুদ্ধের সমস্ত কৌশল শিখে ফেলবে।’

ইরানের ওপর বারবার হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সে ভুলই করল। ঘুঘু বারে বারে ধান খেয়েছ, আর নয়। ২০২৬ সালে ইরান তার শত্রুদের বিরুদ্ধে আরও বেশি কৌশলী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর এখন ইরানের শাসনক্ষমতা মূলত আরও পেশাদার নেতৃবৃন্দের হাতে ন্যস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মহা শয়তান’ বলে গালিগালাজ করার দিন শেষ। ইরানি নেতৃবৃন্দ প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছেন।

নতুন নেতৃত্বে যদিও কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের সংমিশ্রণ রয়েছে, তবে তাঁরা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানেই নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে ইরান দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ইরান তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে বিভিন্ন রিজিওনাল ইউনিটে ভাগ করে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

ইরানের জনগণকে একসময় মনে করা হতো সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই যুদ্ধ তাদের অনেকভাবে সরকার ও সামরিক বাহিনীর পেছনে ঐক্যবদ্ধ করেছে।

ইরানিদের মনোবল বলা যায় এখন যেকোনো সময়ের চেয়েও অনেক ভালো।

প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করছে ইরান।

নিউইয়র্ক টাইমস সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে লিখেছে, ‘মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা নিয়ে ইরান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কোণঠাসা বা ব্যর্থ করার লক্ষ্যে তারা আরও কয়েক মাস ধরে এই সংঘাত চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।’

 

সামরিক শক্তির দিক দিয়ে এটা একটা অসম যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধে জয়–পরাজয় শুধু এক পক্ষের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের নিরিখে নির্ধারিত হয় না, অপর পক্ষের কতটুকু সহনশক্তি আছে, তার ওপরও নির্ভর করে।

ইরানের ব্যাপারেও তা–ই হয়েছে। বিরাট বিরাট রণতরি ও অত্যাধুনিক বোমারু বিমানও টলাতে পারেনি ইরানিদের দৃঢ় মনোবল।

ইরানিরা সমানতালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় বন্ধুদেরও ভীতসন্ত্রস্ত করেছে। প্রচারযুদ্ধেও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘তারা ইরানের আত্মসমর্পণ চায়; ইরানিরা শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে না।’

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, অস্ত্র নয়, এবার তিনি ইরানকে হারাবেন অর্থনৈতিক অবরোধ করে। সেটা আরও হাস্যকর ঠেকেছে।

পৃথিবীর কোনো দেশই তাঁর এ উদ্যোগে সাড়া দেয়নি। চীন ও রাশিয়ার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রভাব নেই, সেটা সমগ্র বিশ্ব জানে।

ট্রাম্পের সেই ‘অর্থনৈতিক ডি-ডের’ দেখা যে মিলবে না, তা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সংবাদমাধ্যম বিশাল বিশাল শিরোনামে প্রকাশ করেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান সদর দপ্তরের কাছে ধোঁয়া উঠছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।ছবি: এএফপি

যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল কী নিয়ে? ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছিল, চেয়েছিল ইরানের সরকারের পরিবর্তন, যাকে তারা বলেছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বন্ধ করতে।

অনেক তর্কবিতর্ক ও মধ্যস্থতা হয়েছে, অনেক ‘এম ও ইউ’ (চুক্তির খসড়া) লেখা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। ইরান তাদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের হতাশ করেছে।

যুদ্ধটা এখন কী নিয়ে? যুক্তরাষ্ট্রের আগের ওই সব দাবিদাওয়া এখন আর তেমন নেই। এখন তারা শুধু চাইছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেন জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে।

কারণ, ইরান হরমুজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় রণতরিও পারছে না হরমুজকে সম্পূর্ণ কবজা করতে।

এখন মনে হচ্ছে, যুদ্ধ–পূর্ববর্তী পরিস্থিতে ফিরিয়ে আনতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র খুশি। তারা শুধু চায় হরমুজে অবাধ জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনতে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্বাভাবিক হয়।

 

তবে ইরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়ছে না, তার কারণ একটাই—ভবিষ্যতে সংঘাত ও আক্রমণের বিরুদ্ধে হরমুজ তাদের বিরাট রক্ষাকবচ।

হরমুজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ইরানের পক্ষে বিশ্বে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে—এটাই যুক্তরাষ্ট্রকে কাবু করার তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে।

কেউ এটাকে দেখছেন ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ, যুক্তরাষ্ট্র এটাকে দেখছে ইরানবিরোধী প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে, অন্যরা যে যার মতো এই চুক্তি নিয়ে বিশ্লেষণ করছে।

তবে একটা বিষয় সম্ভবত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মক্কা চুক্তি ইরান যুদ্ধে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্তত বিশবার উচ্চারণ করেছেন—যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয় হয়েছে এবং যুদ্ধ থেমে গেছে। যুদ্ধ কি সত্যই থেমে গেছে?

আপনি বিশ্বের পাঁচজন বিশিষ্ট সাংবাদিককে প্রশ্ন করুন, তাঁরা পাঁচ রকমের উত্তর দেবেন। আপনি পাঁচজন সমরকৌশলীকে প্রশ্ন করুন, তাঁরাও উত্তর দিতে থতমত খাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘যুদ্ধ বলব না। এখন কোনো সত্যিকার গোলাগুলি নেই।’

তবে যুদ্ধ বলা হোক বা সংঘাত বলা হোক, বৈরিতা রয়েই গেছে। ট্রাম্পের মনমর্জির ওপর নির্ভর করে যুদ্ধক্ষেত্রে কী হচ্ছে! মার্কিন বাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল করে যুদ্ধ চালাচ্ছে না।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ভান্ডারও এখন বেশ সীমিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ মাঝেমধ্যে খেপে গিয়ে ইরানে আক্রমণ চালানোর হুকুম দেন।

ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা খুব কম, কিন্তু তাদের প্রতি–আক্রমণের ক্ষমতা প্রচুর। তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোয় প্রতি–আক্রমণ চালিয়ে আক্রমণের বদলা নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই–তৃতীয়াংশ জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং যেভাবে তেলের দাম বাড়ছে, তাতে জনগণ দারুণ ক্ষুব্ধ। এদিকে সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন।

কানসাস অঙ্গরাজ্যে যেখানে গত ১০০ বছরে কোনো সিনেটর ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত হননি, সেখানে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন এ বছর বেশ আশাবাদী।

তিনি যখন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, ৭৮ বছর বয়স্ক একজন লোক তাঁকে তেল কেনার রসিদটা দেখিয়ে বললেন, এ জন্যই তোমাকে আমি ভোট দেব।

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দারুণ বিপাকে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, যুদ্ধ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ঢিমেতালে চলবে, হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণ ও প্রতি–আক্রমণ হবে।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হলে ট্রাম্প বা তাঁর দলকে পরবর্তী দুই বছরে আর কোন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে না। তখন কি তিনি কোনো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

 

গত এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি মেনে না নিলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস করা হবে’। তিনি মাঝেমধ্যে একই ধরনের হুমকি দিয়ে আসছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সন্ত্রাসবিরোধী সাবেক উপদেষ্টা জো কেন্ট টাকার কার্লসনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত সামরিক উপায়ে ইরানকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটির বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।

আমরা এই বীভৎসতার কথা চিন্তাই করতে পারছি না। আশা করা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্সির বাকি দুই বছর তাঁর লিগ্যাসি নিয়ে কাজ করবেন।

তাঁর সুযোগ রয়েছে, যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করে শান্তির দূত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ছিনিয়ে নেওয়ার। একজন প্রেসিডেন্টের জন্য দায়িত্ব শেষ করার এটাই সম্ভবত সবচেয়ে উত্তম উপায়।

সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর