অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে জ্বালানি খাত বা
এনার্জি সেক্টরের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে দেশের প্রতিটি জ্বালানি খাতে
তিন মাসের রিজার্ভ বা মজুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে (যেখানে অর্থনীতিবিদ
হোসেন জিল্লুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন) অর্থমন্ত্রী আমাদের প্রতিবেদককে জানান,
"অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাথমিক উপাদান হলো এনার্জি সিকিউরিটি।" তিনি বলেন,
দায়িত্ব নেওয়ার সময় সরকার দেখেছিল বেশ কয়েকটি জ্বালানি খাতে মাত্র ১৫ বা ১৭ দিনের মজুত
অবশিষ্ট ছিল। তবে বর্তমানে সেই রিজার্ভ বাড়িয়ে এক মাসে উন্নীত করা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই
এটিকে তিন মাসে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমাদের প্রতিবেদককে তিনি বলেন, এই প্রকট সমস্যা
কোনোভাবেই এক মাসের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই সংকটকালীন
পরিস্থিতি থেকে দেশকে দ্রুততম সময়ে বের করে আনার সব রকম চেষ্টা চলছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের
সংকট কাটাতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গ্যাসের
অভাব পূরণে এফএসআরইউ (FSRU) নিয়ে আলোচনা চলমান আছে এবং পাশাপাশি দেশে অনশোরভিত্তিক
গ্যাসের উৎস ও পাইপলাইন সম্প্রসারণের কাজও শুরু হয়েছে। প্রতিটি জ্বালানি খাতে তিন মাসের
রিজার্ভ নিশ্চিতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ
চৌধুরী আমাদের প্রতিবেদককে জানান, দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে বিনিয়োগের
কোনো বিকল্প নেই। দেশে দেশীয় বিনিয়োগ না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখানে অর্থ লগ্নি
করতে ভরসা পাবেন না। তিনি বলেন, বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত
বেসরকারি খাতের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। আর বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধিই হলো বিএনপির
মূল রাজনৈতিক দর্শন। বেসরকারি খাতই অর্থনীতির চাকা ঘোরাবে, আর সরকারের দায়িত্ব হবে
তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ডিরেগুলেশনের ওপর জোর দিয়ে তিনি আমাদের প্রতিবেদককে
বলেন, শুধু নীতি প্রণয়ন করলেই চলবে না, তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
আর্থিক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী
আমাদের প্রতিবেদককে জানান, এই খাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ আর রাখা
হবে না। তিনি বলেন, "আমরা আর্থিক খাতে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেব না। যেখানে আর্থিক
সংবেদনশীলতার বিষয় জড়িত, সেখানে রাজনীতি প্রবেশ করতে পারে না। মার্কেটকে তার নিজের
নিয়মে চলতে দিতে হবে এবং তাকে সম্মান করতে হবে।" শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং মানদণ্ড
পূরণকারীদেরই সুবিধা প্রদান করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করার
তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, যে অর্থ আর কখনোই আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তা খাতায় দেখিয়ে
কোনো লাভ নেই। এসব সম্পদ নিষ্পত্তি করে ব্যবসায়ীদের নতুন করে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ
দেওয়া দরকার। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (এমএসএমই) উদ্যোক্তাদের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার
একটি নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করার কথা জানিয়ে তিনি আমাদের প্রতিবেদককে বলেন, এই প্যাকেজ
আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ এই ঋণ পেতে ব্যাংকে গিয়ে
বাধাগ্রস্ত হলে তা সরাসরি সরকারকে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।
দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির
মূল স্রোতে আনতে সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির দিকে মনোনিবেশ করছে
বলে অর্থমন্ত্রী জানান। বিনোদন ও ক্রীড়া খাতকে অর্থনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার
ওপর জোর দিয়ে তিনি আমাদের প্রতিবেদককে বলেন, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, সংগীত ও খেলাধুলার
সাথে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে আছে। এত দিন আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেও
এগুলোকে অর্থনীতির মূলধারায় সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
লন্ডনের থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টের কথা উল্লেখ
করে তিনি আমাদের প্রতিবেদককে জানান, সেখানে একটি থিয়েটারকে কেন্দ্র করে টিকিট বিক্রি,
রেস্তোরাঁ, দোকান, আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান, আর্ট গ্যালারিসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ
পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও থিয়েটার, সিনেমা ও খেলাধুলাকে ঘিরে এমন বড় পরিসরের অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বলেন, "এগুলো আমাদের জিডিপির অবিচ্ছেদ্য অংশ,
যা আমরা আগে নগদায়ন (মনিটাইজ) করিনি। এখন এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
প্রসারিত করতে চাই।"
যারা প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থায় ঋণ বা মূলধন
থেকে বঞ্চিত, তাদের নতুন নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করার আপ্রাণ
চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। ওই দিনের আয়োজনে দেশের অর্থনীতির বর্তমান নানা চ্যালেঞ্জ
ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতামত উঠে
আসে।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।