advertisement
advertisement

ক্ষমতার মোহমুক্ত এক রাজনীতিকের বঙ্গভবন জয়: মির্জা ফখরুলের ‘অসাধারণ’ হয়ে ওঠার গল্প


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
ক্ষমতার মোহমুক্ত এক রাজনীতিকের বঙ্গভবন জয়: মির্জা ফখরুলের ‘অসাধারণ’ হয়ে ওঠার গল্প

মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি

advertisement

আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার মোহ, সম্পদের লোভ এবং অহংকার যখন নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা, ঠিক তখনই এমন একজন মানুষের জীবনযাত্রা আমাদের অবাক করে দেয়। তিনি আমাদের রাজনীতিতে সততা, নৈতিকতা, ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের এক বিরল দৃষ্টান্ত। বর্তমান সময়ের ভোগবাদী ও তোষামোদনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাঝে দাঁড়িয়েও তিনি তার জীবনসংগ্রাম এবং রাজনৈতিক দর্শনে এক অসামান্য সাধারণত্ব ধরে রেখেছেন। আর এই অতি সাধারণ জীবনযাপনই তাকে এক অনন্য ও অসাধারণ ব্যক্তিসত্তায় পরিণত করেছে—তিনি হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসীন।

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ধৈর্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত সংযমের ওপর আলোকপাত করাটা কেবল একজন ব্যক্তির স্তুতিগান নয়। এটি মূলত আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত নিয়ে প্রশ্ন তোলার এক দারুণ সুযোগ। ক্ষমতা কি মানুষকে মহৎ করে, নাকি মানুষ তার নিজস্ব উচ্চ নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে ক্ষমতার পদকে সম্মানিত করে? মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ এই পথচলা চিরন্তন এই প্রশ্নেরই এক জ্বলন্ত উত্তর।

 

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনসেবার ঐতিহ্য তার রক্তে মিশে ছিল। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন স্বনামধন্য আইনজীবী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুবারের নির্বাচিত সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, সাবেক স্পিকার এবং ক্যাবিনেট মন্ত্রী। অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা সরাসরি মুজিবনগর সরকারের সাথে যুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছেন।

 

সমৃদ্ধ পারিবারিক পটভূমি তাকে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সুযোগ দিলেও রাজপথের নেতৃত্ব তাকে কেউ উপহারস্বরূপ দেয়নি। নিজের ত্যাগ ও মেধার জোরে তাকে নিজের পথ তৈরি করে নিতে হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকের উত্তাল স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে তিনি সরাসরি ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি সমাজ সংস্কার ও প্রগতিশীল ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটেছিল মেধা, সামাজিক সাম্য এবং প্রগতির চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে।

 

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ক্ষমতার সহজ পথে পা না বাড়িয়ে শিক্ষকতার মতো মহান ও নিভৃত পেশা বেছে নেন। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে তরুণ শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগৎ গড়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি সরকারি প্রশাসনের সাথেও যুক্ত হন এবং ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি প্রবেশের আগে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেতর থেকে দেখা, প্রশাসনিক নিয়মকানুন সম্পর্কে জানা এবং শিক্ষক হিসেবে অর্থনীতি ও সমাজচিন্তাকে বিশ্লেষণ করার এই অমূল্য অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কৌশলকে আরও প্রজ্ঞাবান, সংযত ও যুক্তিনির্ভর করে তুলেছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৮৬ সালে যখন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন সরকারি চাকরি আঁকড়ে ধরে রাখাকে তিনি নৈতিক ও আইনগতভাবে অনুচিত বলে মনে করেছিলেন। ফলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েই তিনি রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ হন। নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে নেওয়া তার এই ছোট অথচ দৃঢ় সিদ্ধান্তটিই প্রমাণ করে যে, তিনি কতটা আত্মপ্রত্যয়ী ও দৃঢ়চেতা একজন মানুষ।

 

১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি সরাসরি জনপ্রতিনিধিত্বের সূচনা করেন। জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর আগে স্থানীয় মানুষের একেবারে কাছাকাছি থেকে তাদের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার হওয়াটা তাকে তৃণমূলের স্পন্দন বুঝতে সাহায্য করেছিল। এরপর ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

 

২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের কৃষি এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ও নিষ্কলঙ্কভাবে পালন করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

 

তবে ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন কেবলই বিজয়ের গল্পে ঘেরা নয়—তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়েরও স্বাদ পেয়েছেন। এই জয়-পরাজয়ের স্বাভাবিক গতিপথই তার ব্যক্তিত্বকে আরও মানবিক এবং খাঁটি করে তুলেছে। কারণ, স্বৈরতান্ত্রিক বা অস্বাভাবিক রাজনীতি বাদ দিলে প্রকৃত গণতন্ত্রে পরাজয়ও একটি মহাসত্য। বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের চেয়ে পরাজিত হয়েও রাজপথ না ছেড়ে দ্বিগুণ উৎসাহে সংগঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার মাঝেই নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা নিহিত থাকে, যা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে ছেড়েছেন।

 

২০০৯ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যা দলটির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও দীর্ঘতম অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

 

বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক ঝড়-ঝাপটা পার করেছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস, তারেক রহমানের নির্বাসন, হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা, হামলা এবং কারাবরণের মতো চরম বৈরী পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজপথে প্রতিবাদের ভাষা বজায় রাখার মতো কঠিন দায়িত্ব একহাতে সামলিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তিনি নিজেও বহুবার কারাবরণ করেছেন, রাজপথে প্রতিপক্ষের রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের রাজনৈতিক সংকটে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ মেয়াদের কারাবাস তার রাজনৈতিক ত্যাগের পরিধিকে আরও প্রসারিত করেছে। চরম উত্তেজনাকর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি কখনো তার ভাষার শালীনতা হারাননি, উগ্র রূপ ধারণ করেননি; বরং তার সংযত ও মার্জিত বাচনভঙ্গি দলের গণ্ডি পেরিয়ে তাকে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। চরম বৈরিতার মাঝেও খোদ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের কাছেও তার নৈতিকতা এবং ভদ্রতা প্রশংসিত হয়েছে।

 

রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা সমীকরণের বাইরেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা আমার স্মৃতিতে চির অম্লান। পল্টনের বিএনপি কার্যালয় বা গুলশানের চেয়ারপারসনের দপ্তরে তার সাথে মুখোমুখি বসে কথা বলা বা চা-বিস্কুট খাওয়ার মুহূর্তগুলোর চেয়েও যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে—তা হলো তার গভীর ও অকৃত্রিম সৌজন্যবোধ।

 

আমি যতবারই তার কক্ষে প্রবেশ করেছি, বয়সের জ্যেষ্ঠতা কিংবা রাজনৈতিক পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে তিনি কখনোই নিজের চেয়ারে বসে আমার সাথে হাত মেলাননি। আমি দরজায় দাঁড়ানো মাত্রই তিনি চেয়ার থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন, হাসিমুখে হাত মিলিয়েছেন। আবার আলোচনা শেষে বিদায় নেওয়ার সময়ও ঠিক একই স্বভাবজাত মৃদু হাসি নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বিদায় জানিয়েছেন। বড় পদের অহংকার কীভাবে ছোট ছোট সৌজন্যবোধের কাছে ম্লান হয়ে যায়, তা ফখরুল সাহেবের সাথে না মিশলে বোঝা সত্যিই কঠিন। আমি বাসায় ফিরে এই মহানুভবতার কথা আমার পরিবারের কাছে অত্যন্ত গর্ব ভরে বলেছি, আমার স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে শিখিয়েছি—মানুষ যত বড় পদেই থাকুক না কেন, বিনয়ই হলো তার আসল পরিচয়। আমার সন্তানও আমার মুখে এই গল্প শুনে মির্জা ফখরুলের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠে।

 

বিশেষভাবে মনে পড়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের সেই থমথমে দিনগুলোর কথা। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা নজরদারি যখন চরমে, যখন গুলশান অফিসে যাতায়াত করা মানেই যেকোনো মুহূর্তে স্টিম রোলারের শিকার হওয়ার ভয়, তখন গুলশান অফিস ও তার চারপাশে বিরাজ করছিল এক শুনশান নীরবতা। সেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও আমি তার সাথে দেখা করতে যাই। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লেখা আমার কলাম ও অন্যান্য নথিপত্র আমি তার হাতে তুলে দিই। একইসাথে জাসাসের উপজেলা পর্যায়ের আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহীর দায়িত্বে থাকার কারণে তৎকালীন আওয়ামী সরকার কর্তৃক আমাকে বিটিভি থেকে বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করা এবং পরবর্তীতে আমার পত্রিকার মিডিয়া তালিকাভুক্তি বাতিল করার মতো অমানবিক অত্যাচারের কথা আমি তাকে জানাই। তিনি অত্যন্ত প্রশান্তি ও গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার প্রতিটি কথা শুনেছিলেন। সেই নির্মমতার কথা আমি তার কাছে ব্যক্ত করেছিলাম। তিনি যে গভীর সহানুভূতি, ধৈর্য এবং সম্মানের সাথে আমার কথাগুলো শুনেছিলেন, তা আমার মতো একজন নগণ্য সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের জন্য পরম প্রাপ্তি ছিল।

 

আজকের রাজনীতির এক মর্মান্তিক সত্য হলো—ক্ষমতার ছোঁয়া পেলেই রাজনীতিবিদদের পোশাক, চলন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার রাতারাতি পরিবর্তন ঘটে যায়। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রতিমন্ত্রী, এমপি এবং দেশের অন্যতম একটি শীর্ষ দলের প্রধান মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পরও মির্জা ফখরুল নিজেকে সেই বিষাক্ত ভোগবাদ থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

 

রাজধানী ঢাকায় তার নিজের নামে কোনো প্লট নেই, কোনো আলিশান ফ্ল্যাট বা বিলাসবহুল বহুতল ভবন নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ব্যক্তিগত যে গাড়িটি ব্যবহার করতেন, সেটি ছিল সর্বোচ্চ সাত থেকে আট লাখ টাকা দামের একটি পুরোনো সাধারণ টয়োটা এক্স করোলা। সাধারণ সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে সাধারণ জুতো এবং মুখে সেই চেনা মৃদু হাসি—এই সরলতাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অলংকার। কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির হিসাব পেতে সরকারি হলফনামাই হলো শেষ কথা, কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষমতা হাতে থাকার পরও নিজেকে বিলাসিতার প্রদর্শনী থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন—তবে রাজনীতির ময়দানে এমনিতেই তিনি এক রূপকথার নায়ক হয়ে ওঠেন।

 

বিএনপির আন্দোলন এবং দীর্ঘ চড়াই-উতরাইয়ের রাজনীতিতে মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক রসায়ন ছিল অত্যন্ত মজবুত। একটি সুবিশাল এবং নিপীড়িত বিরোধী দলকে সুসংগঠিত রাখা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিটি নির্দেশ সুচারুভাবে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া মোটেই সহজ কোনো কাজ ছিল না।

 

তারেক রহমানকে নিয়ে যখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার ছড়ানো হতো, তখন আমি আমার একাধিক কলামে বলেছিলাম যে—তারেক রহমান মূলত একটি আদর্শভিত্তিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছেন এবং তার এই সুদীর্ঘ পথচলায় প্রধান শক্তি হিসেবে পাশে রেখেছেন মির্জা ফখরুলের মতো একজন সম্পূর্ণ সৎ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের মানুষকে। কারণ অসৎ বা বিভ্রান্ত মানসিকতার কোনো নেতৃত্ব কখনোই ফখরুল ইসলামের মতো এমন নিঃস্বার্থ ও আদর্শবান একজন সংগঠককে দিনের পর দিন পাশে রাখতে পারতেন না। তাদের মধ্যকার সুদৃঢ় রাজনৈতিক আস্থাই প্রমাণ করে যে দলটি কতটা গভীরভাবে নীতি ও আদর্শকে ধারণ করতে চেয়েছিল।

 

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে এলো, যা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাস এবং গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে এক নতুন ও সোনালী মাইলফলক স্থাপন করল। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে এক উৎসবমুখর ও টানটান উত্তেজনার আবহে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়। গণনা প্রক্রিয়া শেষে ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনি কর্তা এএমএম নাসির উদ্দিন। মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট এবং তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

 

সংসদ সদস্যদের এই প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং বিপুল ভোটে বিজয়ের পর বঙ্গভবনের দ্বার আজ তার জন্য উন্মুক্ত হলো। রাষ্ট্রপতি পদটি কোনো নির্দিষ্ট দলের নিজস্ব সম্পত্তি নয়; এটি গোটা ১৮ কোটি গণমানুষের সার্বভৌম আস্থার এক অনন্য প্রতীক। অতীত রাজনীতির করাল গ্রাসে রাষ্ট্রপতির বাসভবন কিংবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ নিয়ে জনমনে নানা ধরনের বিতর্ক ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো দেশকে ধারণ করার মতো ব্যক্তিত্বের অভাব যেখানে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল, সেখানে সংসদ সদস্যদের আস্থায় সিক্ত হয়ে মির্জা ফখরুলের প্রবেশে বঙ্গভবন আজ সত্যিই ধন্য হলো।

 

যে মানুষটি নিজের জীবনের বিনিময়ে অটল নীতি ও আদর্শ আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন, যিনি সাধারণ একজন অতিথির সম্মানেও নিজের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে সৌজন্য দেখাতেন—তিনি যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেন, তখন প্রতিটি সাধারণ নাগরিক সেখানে নিজেদের সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতিফলন দেখতে পাবেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বঙ্গভবন এখন থেকে কেবল একটি ঐতিহাসিক অট্টালিকা হয়েই থাকবে না; বরং তা রূপ নেবে সততা, শিষ্টাচার, সংবিধান রক্ষা এবং নাগরিক অধিকারের এক নবজাত ও ধ্রুব সংকেতে।

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনপাঠ কেবল বিএনপির একটি একক অধ্যায় নয়; এটি একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন নিবেদিতপ্রাণ তৃণমূল প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রচিন্তায় ঋদ্ধ এক আদর্শিকের গল্প। তিনি আমাদের রাজনৈতিক সমাজকে এক অমূল্য শিক্ষা দিয়ে গেছেন—ক্ষমতা মানুষকে ক্ষণিকের জন্য বড় করতে পারে, কিন্তু চিরকালের জন্য বড় করে শুধুমাত্র তার নিজের অমলিন চরিত্র।

 

রাজনৈতিক প্রতিপত্তির শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছেও কীভাবে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে মাটির কাছাকাছি থাকা যায়, তা ফখরুল ইসলামের জীবন না দেখলে অসম্পূর্ণই থেকে যেত। রাজনীতির আসল শক্তি গাড়ির গগনবিদারি সাইরেনে নিহিত থাকে না, থাকে মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসায়। অর্থ বা বিত্তের পাহাড় নয়, মানুষের অকৃত্রিম আস্থাই যে একজন রাজনীতিবিদের প্রকৃত ব্যাংক ব্যালেন্স—তা তিনি তার দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিপুল জনরায়ে বিজয়ী হয়ে পদে পদে প্রমাণ করেছেন।

 

আগামীর বাংলাদেশ যদি একটি নতুন, অহংকারমুক্ত, দায়িত্বশীল এবং মানবিক রাজনীতির সোপানে পা রাখতে চায়, তবে মির্জা ফখরুলের এই জীবনগাথাই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পাথেয়। ইতিহাস যখনই সততা ও সাধারণত্বের চরম শক্তিকে মূল্যায়ন করবে, তখন একবাক্যে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে আনবে সেই নামটি—যিনি ক্ষমতার তীব্র স্রোতে গা ভাসিয়ে অসাধারণ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেননি, বরং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত 'অতি সাধারণ' থাকার চরম ব্যাকুলতা দিয়েই ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে 'অসাধারণ' হয়ে উঠেছেন।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর