বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন জীবিত আছেন। মো. আবদুল হামিদ, মো. সাহাবুদ্দিন, হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বাঁ থেকে) ছবি: সংগৃহীত
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি
তাঁদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। অন্যদের বেশির ভাগই পদত্যাগ করেছেন বা করতে
বাধ্য হয়েছেন। আর রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে
নির্বাচিত কোনো রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
অন্যদিকে মেয়াদ শেষ করা রাষ্ট্রপতিদের সবাই
১৯৯১ সালের পর দায়িত্বে আসেন। আর এই রাষ্ট্রপতিদের সেই অর্থে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা
ছিল না।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের
মধ্যে তিনজন জীবিত আছেন। তাঁদের মধ্যে মো. আবদুল হামিদ নির্ধারিত দুই মেয়াদ শেষে স্বাভাবিক
অবসরে যান। আর সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর পদত্যাগের পর
সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) গ্রহণ করেন স্পিকার
হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গত বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে তাঁর শেষ কর্মদিবস ছিল। ওইদিনই বিএনপির
প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায়
তিনি রাষ্ট্রপতির শপথ নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি হয়েছেন দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি। আর
হাফিজ উদ্দিন আহমদ ফিরেছেন স্পিকারের দায়িত্বে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ
পদাধিকারী রাষ্ট্রপতি। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের ইতিহাসে
এ পদ খুব কম সময়ই স্থিতিশীল ছিল। হত্যাকাণ্ড, পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান, গণ-আন্দোলন,
রাজনৈতিক বিরোধ, সংবিধান পরিবর্তনের কারণে বারবার বদলেছে রাষ্ট্রপতির ভাগ্য। সর্বশেষ
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ এই ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করেছে।
স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী
রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে ১৯
জন দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাহাবুদ্দিন ও হামিদ অসুস্থ
বঙ্গভবন থেকে বের হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি
মো. সাহাবুদ্দিনের গাড়ি
বঙ্গভবন থেকে বের হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি
মো. সাহাবুদ্দিনের গাড়িফাইল ছবি: প্রথম আলো
অসুস্থতার কথা বলে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একক প্রার্থী হিসেবে
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার
বিষয়টি নানা সময় আলোচনায় আসে। নানা পক্ষ থেকে তাঁকে অপসারণের দাবি তোলে। এমনকি এই দাবিতে
বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ পর্যন্ত হয়।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি
হতে পারে—এ বিবেচনায় তখন বিএনপিসহ
বিভিন্ন পক্ষ মো. সাহাবুদ্দিনকে তাঁর পদে রাখার পক্ষে যুক্তি দেয়। গত ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর
রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিএনপি অপেক্ষা করবে কি না,
তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী
রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে ১৯
জন দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, বিএনপির পক্ষ
থেকে একপর্যায়ে মো. সাহাবুদ্দিনকে এমন বার্তা দেওয়া হয় যে তারা রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের
কাউকে চায়। তাই তাঁর পদত্যাগ করা দরকার। আর এমনটা করা হলে তাঁকে নিরিবিলি জীবনযাপনে
বাধা দেবে না সরকার। এরপরই সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন রোগে
ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ,
ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামের রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে আমি
মাঝেমধ্যে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার
কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব
হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।’
পদত্যাগ করার পর মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন
ছেড়ে গুলশানে নিজের ফ্ল্যাটে ওঠেন। মো. সাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি বেশ অসুস্থ। তাঁর
এক পা অনেকটাই অবশ। তাঁকে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হচ্ছে। তাঁর মস্তিষ্কে রক্ত
চলাচলে সমস্যা রয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রীয়
দায়িত্ব না থাকায় স্বস্তি আছে। তবে গুরুতর অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা
সম্ভব হচ্ছে না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সময় কাটছে। তবে এর মধ্যেও লেখালেখি করার
চেষ্টা করছেন।
সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি বঙ্গভবনের
দিনগুলো নিয়ে বই লিখছি। ঘটনাবহুল সময়টা লেখায় আনতে চাই।’
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর
মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। পরবর্তী সময়ে তিনি
আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তিনি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। মেয়াদ পূর্ণ করে ২০১৮ সালে তিনি
আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত
হন। দ্বিতীয় দফায় ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ তিনি
মোট ১০ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির পদে
ছিলেন তিনি।
বঙ্গভবন ছাড়ার সময় আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রীয়
আনুষ্ঠানিকতায় বিদায় জানানো হয়। তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। বঙ্গভবনের
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁকে বিদায় জানান। পরে তিনি স্ত্রী রাশিদা
খানমকে সঙ্গে নিয়ে মোটর শোভাযাত্রায় বঙ্গভবন থেকে রাজধানীর নিকুঞ্জের নিজ বাসভবনে যান।
বাংলাদেশে কোনো বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় বিদায় দেওয়ার
ঘটনা এটিই ছিল প্রথম।
রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর আবদুল হামিদ কিছুটা
আড়ালেই ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা
যায়নি। গত বছরের মে মাসে তিনি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যান। প্রায় এক মাস ব্যাংককের
একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গত ৯ জুন তিনি দেশে ফেরেন। তখন তাঁকে নিয়ে বেশ আলোচনা
হয়েছিল।
গত ২৬ জুলাই সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ
ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে
পৃথক অভিযোগ জমা পড়ে। তবে বিষয়টি নিয়ে আর তেমন একটা আলোচনা নেই।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।