advertisement
advertisement

৭. রিজার্ভে স্বস্তি, বিনিয়োগে মন্দা: কেমন কাটল নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস?


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
৭. রিজার্ভে স্বস্তি, বিনিয়োগে মন্দা: কেমন কাটল নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস?

গ্রাফিকস: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

advertisement

বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির বিনিয়োগ, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, বিশাল রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পাহাড়সম চাপের মতো গভীর সমস্যাগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। সরকারের প্রথম ছয় মাস পার হলেও কাঠামোগত এই জটিল সংকটগুলোর দৃশ্যমান কোনো সমাধান আসেনি।

 

তবে ডলার সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ), প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও, দীর্ঘদিন ধরে চলা ঊর্ধ্বমুখী বাজারদরের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি। পাশাপাশি, দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও আশাব্যঞ্জক কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। এর ওপর সাম্প্রতিক সময়ের চরম গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শিল্প খাতের উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

 

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং ঋণের সুদহার কমাতে সরকার এই ছয় মাসে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তা সত্ত্বেও, ব্যাংক, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতের সংস্কার কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনো বেশ ধীর। সার্বিক বিবেচনায় দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও, পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারের যাত্রা এখনো শুরু হয়নি বললেই চলে।

 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজেও স্বীকার করেছেন যে, অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। তবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পুঁজিবাজারের সংস্কার এবং ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মতো বেশ কিছু উদ্যোগের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।

 

অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপট

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাবিধ গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। তীব্র ডলার সংকটের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের পতন দেখা দেয়। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। এর সঙ্গে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করার অভিযোগগুলো তীব্রতর হয়। একই সময়ে বিদেশি ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্প এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে অর্থনীতির এই পতন ঠেকানোর উদ্যোগ নেয়। তারা ব্যাংক খাত ও মুদ্রার বিনিময় হারে বেশ কিছু সংস্কারকাজ শুরু করে। এর ফলে ডলারের সরবরাহ ও রিজার্ভ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটে এবং মূল্যস্ফীতির লাগাম সামান্য টেনে ধরা সম্ভব হয়। তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির চাকা ধীরগতিতেই ঘুরতে থাকে।

 

ফলে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার বাজার পেলেও, সামগ্রিকভাবে একটি দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর দায়িত্বই তাদের কাঁধে এসে পড়ে। এখন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতির হার আরও কমিয়ে আনা এবং এর পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত করা। ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা দূর করতে ইতিমধ্যে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং বন্ধ হয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও নীতি সুদহার কমিয়েছে। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিপুল রাজস্ব ঘাটতি এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে বেশ কঠিন করে তুলেছে।

 

গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ছাড়া শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়াটা স্বাভাবিক। এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে গিয়ে নতুন করে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তারাও নতুন করে বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরীর মতে, অর্থনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের আন্তরিক চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। তবে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংকট এতটাই গভীর ও জটিল যে, এর সমাধান করতে বেশ কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।

 

বাজার পরিস্থিতির বেহাল দশা ও মূল্যস্ফীতির চাপ

গত প্রায় চার বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে জর্জরিত। বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্যও এই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতি কমে সাড়ে ৮ শতাংশে এলেও, বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের চার মাসেই তা ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে। সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে এটি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়ালেও, সাধারণ ক্রেতারা বাজারে এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না।

 

দীর্ঘ সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের আয় বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষদের কিছুটা স্বস্তি দিতে সরকার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে সমাজের সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপে দিন পার করছে।

 

ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি

সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি দেখা গেছে। বিশেষ করে অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির হার ছিল একেবারেই হতাশাজনক।

 

এই কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এনবিআর বিলুপ্ত করে কর নীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়ের কাজ দুটি আলাদা সংস্থাকে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমানে থমকে আছে। ওই সময়কার অধ্যাদেশটি আর সংসদে উত্থাপিত হয়নি।

 

তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সরকার নতুন করে ঋণ প্রস্তাব করার পর, বিষয়টিকে নতুন বিল আকারে সংসদে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এটি পর্যালোচনার জন্য গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হলেও, তিন মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও তাদের কাছ থেকে কোনো সুপারিশ পাওয়া যায়নি।

 

স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকট

দেশে বিনিয়োগ খরায় ভুগছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন কারখানা স্থাপনের আগ্রহ একেবারেই তলানিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির লক্ষ্যে খোলা ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির হার আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে যথাক্রমে সাড়ে ৬ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৪ বছরের মধ্যে জিডিপির তুলনায় বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগের হার সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে, যা মাত্র ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের হারও বিগত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

 

অবশ্য দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের খরা কাটাতে সরকার বহুমুখী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকের ফলস্বরূপ দেশের ১৪টি বড় শিল্পগোষ্ঠী বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোতে বিনিয়োগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে গত ১০ আগস্ট একটি জাতীয় টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।

 

বিনিয়োগ না বাড়ায় শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। গত দশকে দেশে স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। গত ছয় মাসে এই কর্মসংস্থান পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।

 

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অন্তরায় হলো জ্বালানি সংকট, যার অতি দ্রুত সমাধান জরুরি। ব্যাংক খাতও চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। তবে ব্যবসা সহজ করতে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের মতো কিছু ভালো পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে, যার এখন দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

 

ডলার ও রিজার্ভের স্বস্তিদায়ক চিত্র

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই ডলার সংকট কাটতে শুরু করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা ফেরে। বর্তমান সরকার গত ছয় মাসেও সেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাজারে ডলারের বড় কোনো সংকট দেখা যায়নি এবং এর দাম ১২৩ থেকে ১২৪ টাকার ঘরেই স্থির ছিল।

 

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান দুই খাত—প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও রপ্তানি খাত। গত ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ছয় মাস দেশে ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও, জুন ও জুলাই মাসে তা কিছুটা কমে ৩০০ কোটির নিচে নেমে আসায় সামান্য উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির কারণে বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা থাকলেও দেশের রপ্তানি আয়ে গতিশীলতা বজায় রয়েছে।

 

প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ের এই ইতিবাচক ধারায় দেশের রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। ১২ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৩৭ বিলিয়ন (৩,৭০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। আইএমএফ-এর বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতিতেও রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন বা ৩,২২৬ কোটি ডলারের ঘরে অবস্থান করছে।

 

ব্যাংক খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণের বোঝা

ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন বা অবসায়নের জন্য 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন' প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছিল।

 

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এই আইনটি পাস করলেও, এতে একটি বিতর্কিত ধারা যুক্ত করে দুর্বল ব্যাংকের পূর্বতন মালিকদের পুনরায় মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। এর তীব্র সমালোচনা শুরু হলে শেষ পর্যন্ত সরকার সেই ধারাটি বাতিল করতে বাধ্য হয়। নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি আর্থিক খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত এর বাস্তব কোনো রূপ দেখা যায়নি। তবে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক টানাপোড়েন বর্তমানে কিছুটা স্তিমিত হয়েছে।

 

অর্থ পাচার রোধে শক্ত অবস্থান

বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দশ দিনের মাথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের চুক্তি বাতিল করে নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেয়। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গোপন করে রাখা বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ জনসমক্ষে প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারলে পুরো ব্যাংক খাতকে বড় ধরনের বিপদে পড়তে হবে।

 

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ১০টি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধের অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত বর্তমান সরকারও অব্যাহত রেখেছে। ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া ৪২টি প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, তার জোর তদন্ত চলছে। বিদেশে পাচার হওয়া এসব সম্পদ খুঁজে বের করতে আটটি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছে।

 

ক্রমবর্ধমান বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ

বর্তমান সরকারের জন্য আরেকটি বিশাল বোঝা হলো বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশ রেকর্ড ৪৫০ কোটি (সাড়ে ৪ বিলিয়ন) ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত ১৪ বছরে এই ঋণ পরিশোধের চাপ চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

আগামী বছরগুলোতে এই চাপ আরও বাড়বে। কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে নেওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণের কিস্তি খুব শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনালের ঋণ শোধ করতে হবে জাপানকে। এর পাশাপাশি, কর্ণফুলী টানেল ও মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধও এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

 

কাজেই অত্যন্ত সাবধানে ঋণ ব্যবস্থাপনা করা, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নতুন করে বিদেশি ঋণ না নেওয়া এবং ঋণের টাকায় করা প্রকল্পগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল বের করে আনাই এখন বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

 

সুদ কমানো কতটা কাজে দেবে এবং সমাধানের দীর্ঘ পথ

অর্থনীতিতে গতি আনতে বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল নীতি সুদহার হ্রাস। দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ ২১ মাস পর গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে। সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমবে, যা উদ্যোক্তাদের ব্যবসার খরচ কমিয়ে নতুন বিনিয়োগে তাদের আগ্রহী করে তুলবে।

 

তবে নীতি সুদহার কমালেই যে রাতারাতি ব্যাংক ঋণের সুদহার কমে যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধুমাত্র সস্তা ঋণ পেলেই ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন না। বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, সহজ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং ধারাবাহিক কর কাঠামোর মতো বিষয়গুলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যাংক খাতের সার্বিক সক্ষমতা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হওয়ার ওপরই নীতি সুদহার কমানোর সাফল্য নির্ভর করছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরী প্রথম আলোকে জানান, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই, কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংকট এতটাই গভীরে যে এর সমাধান বেশ সময়সাপেক্ষ। দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এবং শিক্ষিত তরুণ ও নারীদের মাঝে বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে।

 

তার মতে, অর্থনীতির এই সমস্যাগুলো অত্যন্ত মৌলিক প্রকৃতির। আমদানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি খাতে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই জ্বালানি সংকটের সমাধান ছাড়া অর্থনীতির অন্য কোনো প্রচেষ্টাই সফলতার মুখ দেখবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নিচু হচ্ছে, যেদিকে সরকারের জরুরি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

 

ব্যাংক খাত সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র নীতি সুদহার কমানোর ফলেই ঋণের সুদ কমবে এমনটা বলা মুশকিল। ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতকে পুরোপুরি সবল না করা পর্যন্ত শুধু নীতি সুদহার কমিয়ে ঋণের খরচ কমানো কঠিন। একইসঙ্গে, জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তাদের ঋণের চাহিদাও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর