advertisement
advertisement

জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হাকাইন্ডে হিচিলেমা


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হাকাইন্ডে হিচিলেমা

জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হাকাইন্ডে হিচিলেমা রাজধানী লুসাকার কাবুলঙ্গা বয়েজ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে ভোট দেন। ১৩ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এএফপি

advertisement

আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন হাকাইন্ডে হিচিলেমা। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করে। মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৬০ শতাংশ নিজের ঝুলিতে পুরে নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করেছেন তিনি। তামা উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় এই দেশটিতে গত বৃহস্পতিবার মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে নির্বাচনের ঠিক আগে বিরোধী শিবির থেকে ব্যাপক অনিয়ম, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংসতার মতো বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

 

২০২১ সাল থেকে জাম্বিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন হিচিলেমা। এবারের নির্বাচনে তাঁর বিপরীতে আরও ১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সাবেক প্রাদেশিক মন্ত্রী ব্রায়ান মুন্দুবিলে। উল্লেখ্য, এবারই প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়েছেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের চেয়ারপারসন মওয়াঙ্গালা জালৌমিস জানিয়েছেন, ব্রায়ান মুন্দুবিলে প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তিনি আরও জানান, মোট ২২৬টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে মাত্র পাঁচটি আসনের ফল তখনো গণনা করা বাকি ছিল। তবে সেই ফলগুলো চূড়ান্ত বা সামগ্রিক ফলাফলে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনবে না বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

 

বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর ৬৪ বছর বয়সী হিচিলেমা তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের প্রতি আস্থা রাখায় আমরা সত্যিই আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।" একই সঙ্গে, যারা তাঁকে ভোট দেননি বা অন্য প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন, তাদের কল্যাণেও নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রাজধানী লুসাকার রাজপথে নেমে আসেন তাঁর দল ‘ইউনাইটেড পার্টি ফর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউপিএনডি)’-এর হাজারো সমর্থক। লাল পোশাকে সজ্জিত এসব কর্মী-সমর্থক নাচ, গান ও আতশবাজির মাধ্যমে তাদের আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করেন।

 

নির্বাচন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ ও উত্তেজনা

চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই ভোট গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুন্দুবিলে। গত সোমবার তিনি অভিযোগ করেন যে, ভোট গণনায় ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন না করেই তিনি দাবি করেন, ভোটের ফল লেখা কিছু নথিপত্রে রদবদল করা হয়েছে, যা পুরো গণনা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশের কর্মকর্তাদের ওপর ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও আনেন।

 

এদিকে, জাম্বিয়া সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে মুন্দুবিলের দল এনআরপিইউপির সদস্যরা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। গত রোববার রাতে সরকারের এক ঘোষণায় জানানো হয়, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিরোধী দলের ছয়জন নেতা-কর্মীসহ মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সরকারের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সশস্ত্র বিদ্রোহে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মুন্দুবিলের দল এনআরপিইউপি এই অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে, এই অভিযান মূলত মুন্দুবিলের বাসভবনেই চালানো হয়েছিল এবং সেখানে গোলাগুলির ঘটনায় তাদের দলের একজন সংসদ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সরকারের অভিযোগগুলোকে ‘ডাহা মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে দলটি স্পষ্ট করেছে যে তাদের কোনো সদস্য বা নেতা এ ধরনের বেআইনি ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।

 

মাঝপথে ভোট গণনা স্থগিত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ভোট চলাকালে গত শুক্রবার ব্যালট পেপার চুরি এবং ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠার পর প্রায় ছয় ঘণ্টার জন্য ভোট গণনা স্থগিত রাখা হয়েছিল। এই ঘটনার জেরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় নির্বাচন কমিশনকে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি ও ‘নিরাপত্তা হুমকি’ নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানিয়ে পুনরায় গণনা শুরু করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলো সতর্ক করে বলেছে, এভাবে ভোট গণনা মাঝপথে বন্ধ রাখার ফলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভোটারদের আস্থার জায়গাটি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

 

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও হিচিলেমার সাফল্য

এবারের নির্বাচনটিকে হাকাইন্ডে হিচিলেমার প্রথম পাঁচ বছরের শাসনামলের মূল্যায়নের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তাঁর মেয়াদে দেশটির অর্থনীতি আবারও প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে। ঋণ পুনর্গঠন এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনাকে নিজ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন হিচিলেমা। যদিও সমালোচকদের দাবি, এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল এখনো দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাম্বিয়ার ২ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখনো দৈনিক ৩ ডলারের কম আয় নিয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

উল্লেখ্য, আফ্রিকা মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম তামা উৎপাদনকারী দেশ জাম্বিয়ায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯১ সালে দেশটিতে বহুদলীয় রাজনীতি পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত যতবারই রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তিত হয়েছেন, প্রতিবারই তা নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর