advertisement
advertisement

বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ৩:৩৭ অপরাহ্ণ
বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় এই জাহাজ কাটার সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে

advertisement

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এরই মধ্যে তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এখন পর্যন্ত এই তিন কমিটির কোনো সদস্যই দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির কাছে ঘেঁষতে পারেননি। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সোমবার থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।

 

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের দেওয়া তথ্যানুসারে, ঘটনাস্থলে গ্যাসের তীব্র উপস্থিতি এবং মারাত্মক বিষক্রিয়ার প্রবল ঝুঁকির কারণেই মূলত আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা জাহাজের ধারেকাছে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই অচলাবস্থা নিরসনে শিল্প মন্ত্রণালয় এবার বুয়েটের রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। এর পাশাপাশি পুরো জাহাজটিকে গ্যাসমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার দুর্ঘটনার দিনেই শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সিদ্ধার্থ ভৌমিকের সই করা এক আদেশের মাধ্যমে অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে প্রধান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। একই দিনে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হককে প্রধান করে ৯ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করেন। এছাড়া, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনও নিজেদের উদ্যোগে সেদিন ৩ সদস্যের একটি তদন্ত দল তৈরি করেছিল।

 

পূর্বের কমিটিগুলো দুর্ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হওয়ায়, গত রোববার সন্ধ্যায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. আরিফুল ইসলাম প্রিন্সের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে নতুন এই ৮ সদস্যের বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ দলটি গঠন করা হয়। এই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বুয়েটের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমদ এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, এর আগে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন একটি বিশেষজ্ঞ দল চেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছিল। গতকাল বিকেলে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম ওই চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি জানান যে, দুর্ঘটনার পর থেকে ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা কাজ করলেও গ্যাস লিকেজের আসল উৎস বা কারণ এখনো অজানা। লিকেজটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা গেছে কি না, কিংবা সেখানে অন্য কোনো গ্যাসের উপস্থিতি আছে কি না এবং থাকলে তার পরিমাণ কতসেসব বিষয়েও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মূলত গ্যাসের তীব্রতার কারণেই তদন্তকাজ শুরু করা যায়নি এবং এমনকি গ্যাসের কোনো নমুনা পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার প্রথম আলোকে জানান, রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির যেসব প্রকোষ্ঠে এখনো গ্যাস জমে আছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, সেখানে গ্যাসের পরিমাণ, প্রকৃতি, লিকেজের উৎস শনাক্তকরণ এবং তা বন্ধের কার্যকর উপায় বের করার জন্যই শিল্প মন্ত্রণালয় এই বিশেষায়িত দলটিকে দায়িত্ব দিয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপকের নেতৃত্বাধীন এই ৮ সদস্যের কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আজ থেকেই তারা তাদের কাজ শুরু করেছেন। শফিউল আলম তালুকদার আরও উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস বাতাসের চেয়েও ভারী এবং অত্যন্ত বিষাক্ত। এই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে যেন আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তদন্ত কমিটির কাউকে জাহাজের ঘটনাস্থলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সবার আগে সম্ভাব্য স্থানগুলোকে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কাজে বিশেষজ্ঞ দলের পাশাপাশি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দেশীয় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নেওয়া হতে পারে।

 

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল কারখানায় একটি পুরোনো স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। ঘটনার পর সেখানে উপস্থিত শুভ জলদাস নামের এক শ্রমিক প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজের একেবারে তলদেশের একটি ট্যাংক কাটার সময় সেখান থেকে হঠাৎ করেই মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলেই এই ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর