ছবি : সংগৃহীত
সার
বিতরণ কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং নজরদারি
জোরদার করতে সরকার একটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগের খুচরা
সার বিক্রি এবং সাব-ডিলার ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বাতিল করে দিয়ে সরাসরি ডিলারভিত্তিক
একটি নতুন বিতরণ পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তকে
ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
সরকারের
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই নতুন ব্যবস্থার ফলে সার বিতরণের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবেন
(অর্থাৎ ডিলাররা), তাদের একটি সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে।
কোন সার কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে, বাজারে কৃষকরা তা সরকার নির্ধারিত দামে কিনতে পারছেন
কি না এবং প্রকৃত কৃষকের হাতেই সার পৌঁছাচ্ছে কি না—এই সমস্ত বিষয়ে তদারকি করাটা আগের
চেয়ে অনেক বেশি সহজ হবে।
অন্যদিকে,
এই সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতা করেছেন তৃণমূল পর্যায়ের খুচরা সার বিক্রেতারা। তাদের
শঙ্কা, সারা দেশের প্রায় ৪৪ হাজার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ খুচরা বিক্রেতাকে এই ব্যবস্থা
থেকে বাদ দিয়ে পুরো সরবরাহ চক্রের নিয়ন্ত্রণ যদি মাত্র কয়েক হাজার ডিলারের হাতে তুলে
দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় সার বাজারগুলো অল্প কিছু ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ীর হাতের মুঠোয়
চলে যাবে, যা থেকে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এই
বিষয়ে কৃষি বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন যে, সরকারের এই পদক্ষেপের যেমন কিছু ইতিবাচক
দিক রয়েছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও কম নয়। যদি এই নতুন ব্যবস্থাটি মাঠে ঠিকমতো কার্যকর
না হয়, তবে এর চূড়ান্ত নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে কৃষকদেরই। অপরদিকে, এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত
হলে সরকার নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যেই কৃষকদের সার পাওয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে
খুচরা বিক্রেতাদের প্রথাটি বাতিল হয়ে গেলে কৃষকদের জন্য সার কেনার ক্ষেত্রে পরিবহন
খরচ এবং সময়—উভয়ই বেড়ে যেতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে,
সরকারের এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিলের দাবিতে গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে
একটি অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ‘খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ নামের
একটি সংগঠন। এই কর্মসূচির পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ
আমিন উর রশিদ এবং কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠকও করেছে।
উল্লেখ্য,
গত ১০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা
২০২৫ (সংশোধিত)’ শীর্ষক একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এর আগে, দেশে ইউরিয়া সারের
ডিলারশিপ প্রদান করত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং নন-ইউরিয়া
সারের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালন করত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংশোধিত
এই নতুন নীতিমালায় এই দুটি পৃথক ডিলার প্রদানকারী কাঠামোকে একীভূত করা হয়েছে। শুধু
তাই নয়, আগের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণহীন সাব-ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতা প্রথাকে
সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এর স্থলে নতুন ‘বিক্রয় প্রতিনিধি’ ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে।
এই নীতিমালায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার জন্য সর্বোচ্চ তিনজন করে ডিলার নিয়োগের
নিয়ম রাখা হয়েছে এবং প্রত্যেক ডিলারকে তার জন্য নির্ধারিত এলাকার মধ্যে নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র
স্থাপন করে কৃষকদের কাছে সরাসরি সার বিক্রি করতে বলা হয়েছে।
সংশোধিত
ওই নীতিমালায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন ডিলার তার মূল ব্যবসা কেন্দ্রের বাইরে
অতিরিক্ত আরও দুটি বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা করতে পারবেন। এই অতিরিক্ত বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে
স্থানীয় বাসিন্দাদেরকেই ‘বিক্রয় প্রতিনিধি’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই বিক্রয় প্রতিনিধিদের মনোনীত করবেন সংশ্লিষ্ট ডিলাররাই, তবে সেই মনোনয়নের চূড়ান্ত
অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে উপজেলা অথবা জেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির হাতে।
কৃষি
মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় ডিলার, সাব-ডিলার
এবং সবশেষে খুচরা বিক্রেতা—এমন একাধিক স্তর থাকার কারণে সরবরাহ চক্রের একেবারে শেষ
প্রান্তে গিয়ে সার আসলে কার হাতে পৌঁছাচ্ছে, সেখানে এর দাম কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিংবা
সার অবৈধভাবে কোথায় মজুদ করে রাখা হচ্ছে—এসব তথ্য বের করা বা অনুসরণ করা অত্যন্ত কঠিন
একটি কাজ ছিল। কিন্তু নতুন এই ব্যবস্থায় সার সরবরাহের পুরো দায়িত্ব এককভাবে শুধু ডিলারদের
হাতে ন্যাস্ত করার কারণে তাদের একটি সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তবে
এর বিপরীতে খুচরা সার বিক্রেতাদের বক্তব্য হলো, তারা ২০০৯ সাল থেকে সরকারের দেওয়া বৈধ
অনুমোদন ও কার্ড ব্যবহার করেই কৃষকদের কাছে নিয়মিত সার বিক্রি করে আসছেন। তাদের হিসাব
অনুযায়ী, সারা দেশে এমন কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৪৪ হাজার এবং এই ব্যবসার
ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবারসহ লাখো মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। দীর্ঘদিনের এই ব্যবসায়িক
সম্পর্ক, ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ এবং কৃষকদের সঙ্গে বাকিতে সার কেনাবেচার যে লেনদেন রয়েছে,
সেই অবস্থায় হঠাৎ করে তাদের এই ব্যবসা থেকে ছুড়ে ফেললে যে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন
তারা হবেন, তা সামলানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
খুচরা
বিক্রেতারা আরও যুক্তি দেখিয়েছেন যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের পক্ষে সবসময় দূরে কোনো
নির্দিষ্ট বিক্রয় কেন্দ্রে গিয়ে সার কিনে আনা সম্ভব হয় না। স্থানীয় দোকানিদের সঙ্গে
কৃষকদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বাকিতে সার পাওয়ার সুবিধা এবং সবচেয়ে বড় কথা,
নিজের বাড়ির একদম কাছাকাছি সার পাওয়ার যে সুযোগ—এসবের ওপর ভিত্তি করে খুচরা বিক্রেতারা
গ্রামে একটি অনানুষ্ঠানিক অথচ অত্যন্ত কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা বা অবকাঠামো তৈরি করেছেন।
এই বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুধু প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বা তদারকি সহজ করার
লক্ষ্যে সরবরাহ চক্রকে ছোট করে আনলে মাঠে সার সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত
হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
আন্দোলনকারী
সংগঠন ‘খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সভাপতি মো. ফোরকান আমাদের
দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ‘আমরা সম্পূর্ণ সরকারি অনুমোদন নিয়েই এত দিন সার সরবরাহ
করে আসছিলাম। আমরা একদম গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে কাজ করি। কৃষকের হাতে সবসময় নগদ টাকা থাকে
না, তাই তারা আমাদের কাছ থেকে বাকিতে সার কেনেন এবং ফসল ওঠার পর সেই টাকা পরিশোধ করেন।
এই ধরনের সেবা দেওয়ার কারণে কৃষকদের সঙ্গে আমাদের একটি আত্মিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক
গড়ে উঠেছে। সারা দেশে আমাদের মতো প্রায় ৪৪ হাজার খুচরা সার বিক্রেতা রয়েছেন। সরকারের
এই সিদ্ধান্তে এই পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়বে। এর পাশাপাশি, কৃষকদের কাছে
আমাদের যে বিপুল অঙ্কের টাকা বাকি পড়ে আছে, তা আদায় করার ক্ষেত্রেও বিরাট ঝুঁকি তৈরি
হবে। আবার বাজারে যদি পর্যাপ্ত বিক্রেতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকে, তাহলে অল্প কয়েকজন
ডিলার সহজেই কৃষকদের জিম্মি করে ফেলার সুযোগ পাবেন। আমরা ইতিমধ্যে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের
সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তারা বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য আমাদের কাছে
সময় চেয়েছেন। আমরা আশাবাদী যে, এই সমস্যার একটি যৌক্তিক সমাধান বের হয়ে আসবে।’
অবশ্য
দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিলার পয়েন্টে গিয়েও কৃষকদের সার না পাওয়া বা খুচরা বাজারে সরকার
নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির প্রচুর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি চলতি
আমন মৌসুমেও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গত
বছর এই নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে,
বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়া, এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং ডিলারদের
কারসাজি বা সিন্ডিকেট ঠেকাতেই মূলত পুরো কাঠামোটিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সে সময় কৃষি
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আমাদের এও জানিয়েছিলেন যে, সার বিতরণে বিভিন্ন
অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এমন দুই হাজারের বেশি ডিলারকে তারা শনাক্ত করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে
কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও তারা তখন জানিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের
মতে, ডিলারের সংখ্যা যদি কম হয়, তবে প্রত্যেকের ওপর প্রশাসনিক নজরদারি বা তদারকি করাটা
তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সহজ হতে পারে। যদি ডিজিটাল পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট
বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা, গুদামজাতকরণ এবং বরাদ্দ ও বিক্রির যাবতীয় তথ্য ঠিকমতো সংরক্ষণ
করার বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে সার সরবরাহের প্রতিটি ধাপের সুনির্দিষ্ট
তথ্য সরকারের হাতে থাকবে। এর ফলে বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, অবৈধ মজুদ গড়ে তোলা
কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করার মতো ঘটনাগুলো শনাক্ত করা অনেক সহজ হওয়ার কথা।
কিন্তু
মুদ্রার উল্টো পিঠে সংকটের আশঙ্কার কথাও জোরালোভাবে বলা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় যেহেতু
একজন ডিলারের অধীনে একাধিক বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনার সুযোগ থাকছে, তাই স্থানীয় বাজারে
ওই একক ডিলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে। যদি বাজারে পর্যাপ্ত
প্রতিযোগিতা না থাকে, নিয়মিত কঠোর তদারকি না হয় এবং বিকল্প কোনো সরবরাহকারী না থাকে,
তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সারের বিন্দুমাত্র সংকট দেখা দিলেই ওই ডিলার কার্যত
পুরো বাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক বা একচেটিয়া কর্তা হয়ে উঠতে পারেন। বিশেষ করে সারের
ভরা মৌসুমে সরবরাহ সামান্য বিঘ্নিত হলেই সারের দাম এবং প্রাপ্যতা উভয়ের ওপর এর মারাত্মক
প্রভাব পড়তে বাধ্য।
এ
বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএইচএম সাইফুল
ইসলাম আমাদের বলেন, ‘যেকোনো বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় থাকলে ক্রেতাদের দরকষাকষির একটি
সুযোগ থাকে। কিন্তু বাজারে বিক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে গুটিকয়েক বিক্রেতার পক্ষে প্রভাব
বিস্তারের সহজ সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যাটি
আরও বেশি প্রকট। এ কারণেই সরকার যদি খুব কঠোরভাবে বাজার তদারকি করতে পারে কিংবা যেকোনো
ধরনের অনিয়ম হলে সাথে সাথে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, কেবল তাহলেই এই নতুন
ব্যবস্থায় কিছুটা স্বচ্ছতা ফিরে আসতে পারে। আর সেজন্য কাদের হাতে এই ডিলারশিপ তুলে
দেওয়া হচ্ছে, সেটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি অসাধু ব্যক্তিদের হাতে ডিলারশিপ চলে
যায়, তাহলে সেখানে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির প্রবল শঙ্কা থেকেই যাবে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক
প্রভাব খাটিয়ে ডিলারশিপ নেওয়ার বিষয়টিও পরবর্তীতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।’
তিনি
আরও যুক্ত করেন, ‘একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতা প্রথাটি যদি পুরোপুরি তুলে
দেওয়া হয়, তাহলে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে কৃষকদের অর্থ এবং সময়—দুটোই আগের চেয়ে বেশি ব্যয়
হতে পারে। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় একজন কৃষক তার বাড়ির পাশের পরিচিত দোকান থেকেই সহজে
সার কিনতে পারছেন। কিন্তু বিক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে তাকে বাধ্য হয়ে বেশ কিছুটা পথ
পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকেই সেটি সংগ্রহ করতে হবে।’
বিশিষ্ট
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আমাদের দেওয়া তার মতামতে জানান, ‘ডিলারদের মাধ্যমে
সার বিতরণের এই উদ্যোগটি এমনিতে ভালো। এর মাধ্যমে সারের পুরো বিতরণ ব্যবস্থাটি অনেকটাই
সহজ হয়ে আসবে। তবে শর্ত হলো, ডিলারদের অধীনে যেসব বিক্রয় প্রতিনিধি কাজ করবেন, তাদের
অবশ্যই অভিজ্ঞ হতে হবে এবং সমাজে সুনাম আছে এমন ব্যক্তিদেরকেই এই কাজের জন্য বেছে নিতে
হবে। এটি করা গেলে কৃষকদের সার পাওয়ার বিষয়টি অনেক সহজ হবে।’
তবে
তিনি এও সতর্ক করে দেন যে, নিয়মিতভাবে কঠোর তদারকি না করলে যেকোনো সংকটকালে সবচেয়ে
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ওই কৃষকরাই। তিনি বলেন, ‘ডিলারদের দায়িত্ব হলো ভর্তুকি মূল্যে
এবং সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করা। এখানে যদি কোনো ধরনের দুর্বৃত্তায়ন বা কারসাজি
না হয়, তবে এই সিদ্ধান্তটি দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে। কিন্তু কোনো কারণে সারের ক্রাইসিস
বা ঘাটতি দেখা দিলে তখন ডিলারদের মধ্যে দুর্বৃত্তায়ন দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
এ কারণেই সরকারি মনিটরিং বা নজরদারি ব্যবস্থাটাকে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি জোরালো হতে
হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম পেলেই সাথে সাথে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
একাধিক
বিশ্লেষকের মতে, সরকার চাইলে এই ডিলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে চালু রেখেই স্থানীয় পর্যায়ের
বিক্রয় প্রতিনিধিদের সমস্ত কার্যক্রমকে আরও বেশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে পারে।
তাদের পরামর্শ হলো, প্রতিটি বিক্রয় কেন্দ্রের দৈনিক বিক্রি, সারের মজুদ এবং সরকারের
দেওয়া বরাদ্দের যাবতীয় তথ্য একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রকাশ করার ব্যবস্থা
করতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষকদের যেকোনো অভিযোগ দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা এবং প্রয়োজনে
ডিলার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সার্বিক
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আমাদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে
জানান, ‘সরকার এখনো কারো সার বিক্রির অনুমোদন বা লাইসেন্স স্থগিত করেনি। মূলত এখানে
একটি ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আজ (মঙ্গলবার) আমার সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের
একটি ফলপ্রসূ মিটিং হয়েছে, পরবর্তীতে তারা আমাদের সচিব সাহেবের সঙ্গেও বিস্তারিত কথা
বলেছেন। আমি আশা করি, খুব শিগগিরই এই সমস্যা বা ভুল বোঝাবুঝির সব অবসান হবে এবং সব
ঠিক হয়ে যাবে।’
মন্ত্রী
আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি নিজে যে ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেছি, সেখানে যে কটি বাজার রয়েছে,
তার প্রত্যেকটিতেই সারের দোকান আছে। এর কারণ হলো, ওই নির্দিষ্ট বাজার এলাকার একজন কৃষককে
যদি অন্য কোনো বাজার থেকে সার আনতে হয়, তবে তাকে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে, যা কষ্টসাধ্য।
আমরা কোনো ব্যবসায়ীকেই বলিনি যে তাদের সার বিক্রি করাটা অবৈধ। তবে আমরা এখন মূলত অফিশিয়াল,
সরকারের দ্বারা নির্বাচিত বা নিয়োগপ্রাপ্ত এবং সার্টিফায়েড ডিলারের সংখ্যা ঠিক কতজন
হবে, তা নির্দিষ্ট করার জন্য কাজ করছি। আগে যারা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা
কখনোই এই সিস্টেম থেকে মাইনাস বা বাদ পড়ছেন না। তাদের মধ্যে যারা আমাদের বেঁধে দেওয়া
নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া বা যোগ্যতার মধ্যে পড়বেন, তারা ডিলারশিপের জন্য আবেদন করলে আমরা
অবশ্যই তা যাচাই-বাছাই করে দেখব। যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তবে আমরা তাদেরকেই রাখব। কিন্তু
মনে রাখতে হবে, পুরো প্রক্রিয়াটি হবে সম্পূর্ণ সিস্টেমেটিক বা পদ্ধতিগত এবং অবশ্যই
জবাবদিহিমূলক।’
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।