advertisement
advertisement

রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ, প্রতিরক্ষা ও সামাজিক খাতের বিপুল ব্যয়ে অর্থনীতিতে চাপ


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ২:২৯ পূর্বাহ্ণ
রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ, প্রতিরক্ষা ও সামাজিক খাতের বিপুল ব্যয়ে অর্থনীতিতে চাপ

ওয়াশিংটনে মার্কিন ট্রেজারি বিল্ডিং | ছবি: রয়টার্স

advertisement

গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ একটি নতুন এবং উদ্বেগজনক রেকর্ড গড়েছে। দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ এখন ৪০ ট্রিলিয়ন বা ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মূলত ফেডারেল সরকারের নানামুখী উচ্চ ব্যয়ের কারণেই অর্থনীতির ওপর এই বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে। এই ব্যয়ের প্রধান খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্ধিত প্রতিরক্ষা বাজেট, মেডিকেয়ার ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং পাহাড়সম ঋণের বিপরীতে বাড়তে থাকা সুদ পরিশোধের চাপ।

 

আমাদের কাছে আসা একটি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মাত্র পাঁচ মাস আগে, গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘর ছুঁয়েছিল। এরও পাঁচ মাস আগে, অর্থাৎ গত অক্টোবরে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার।

 

অভূতপূর্ব এই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সাংঘর্ষিক বা পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারকে স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে গত প্রায় ছয় মাস ধরে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানোর চেষ্টাও সরকারি কোষাগারের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

 

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই জানান, ট্রাম্প প্রশাসন মূলত সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়, জালিয়াতি এবং বিভিন্ন অনিয়ম কমিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো জিডিপির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের অনুপাতকে একটি সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথে নিয়ে আসা।

 

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা এই ঋণ এবং এর নতুন রেকর্ড এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এর ফলে বাড়ি বা গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তারা কর্মীদের উপযুক্ত মজুরিও দিতে পারছে না। একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপণ্য ও সেবার দামও ঊর্ধ্বমুখী।

 

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সংকট ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান ‘পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান নির্বাহী মাইকেল এ পিটারসন বলেন, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে চাইলে আইনপ্রণেতাদের এখনই আরও সাশ্রয়ী এবং টেকসই একটি আর্থিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে হবে। এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—উভয় প্রজন্মের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।

 

মূলত সরকারের আয়ের (কর থেকে প্রাপ্ত) চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণেই বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই ঋণ দ্রুতগতিতে বেড়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় মার্কিন অর্থনীতির একটি বড় অংশ থমকে গিয়েছিল। সেই অর্থনীতিকে আবারও চাঙ্গা ও স্থিতিশীল করতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনামলে ফেডারেল সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করতে হয়েছিল।

 

গত বছর মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানদের উত্থাপন করা কর হ্রাস এবং সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত একটি বিলে স্বাক্ষর করে সেটিকে আইনে পরিণত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর মাধ্যমে সরকারি পর্যায়ে আরও অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।

 

অন্যদিকে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটের পক্ষে থাকা সমর্থকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বেশি বেশি ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা এবং ঋণের ওপর আরও বেশি সুদ গোনার বিষয়টি ভবিষ্যতে আমেরিকানদের অত্যন্ত কঠিন কিছু আর্থিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

 

‘বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টার’-এর প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী মার্গারেট স্পেলিংস বলেন, ফেডারেল সরকারের এই বিশাল ঋণ এরই মধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য খাতে সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসছে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি এবং সাধারণ আমেরিকানদের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির পথে একটি বড় হুমকি।

 

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান এই আর্থিক গতিপথ কোনোভাবেই টেকসই হওয়ার মতো নয়। এটি যদি সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিও হয়, তবুও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে কর্মসংস্থানের বড় পরিবর্তন, অর্থনৈতিক মন্দা, কোনো বৈশ্বিক যুদ্ধ বা এই জাতীয় যেকোনো ঘটনা খুব দ্রুত পরিস্থিতিকে একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ থেকে পূর্ণাঙ্গ সংকটে পরিণত করতে পারে।

 

যুক্তরাষ্ট্রে আইনগতভাবে জাতীয় ঋণের একটি সর্বোচ্চ সীমা বা ‘ডেট লিমিট’ নির্ধারণ করা রয়েছে। এই সীমা নির্ধারণ, তা বাড়ানো কিংবা পুরোপুরি বাতিল করার একক ক্ষমতা রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের হাতে। বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টারের একটি হিসাব বলছে, ২০২৭ সালের শীতের শেষ দিক থেকে শুরু করে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সেই নির্ধারিত সীমায় পৌঁছে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সময় ঋণসীমা বাড়ানো বা সেটি স্থগিত রাখার বিষয়ে কংগ্রেসকে আবারও নতুন করে ভোটের আয়োজন করতে হবে।

 

এদিকে, অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) সাম্প্রতিক একটি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অবস্থাই সবচেয়ে বেশি নাজুক ও খারাপ।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর