advertisement
advertisement

কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ
কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

advertisement

কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রাকে প্রায় ৫৪ শতাংশ বাড়িয়ে এবার নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি, এই ঋণের টাকা যাতে কোনোভাবেই অপব্যবহার না হয়ে প্রকৃত কৃষকের হাতেই পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নতুন এই নীতিমালায় প্রথমবারের মতো উট পালন, হ্যাচারিতে মাছের পোনা এবং হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকেও কৃষিঋণের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

 

সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অবস্থিত জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এই নতুন কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা এবং কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালকবৃন্দ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন।

 

ঘোষিত নতুন এই নীতিমালায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

 

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান জানান, দেশের জাতীয় আয়ে কৃষি খাতের যে বিশাল অবদান, সেই অনুপাতে এই খাতে ঋণের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। এই বৈষম্য দূর করতেই মোট ব্যাংকঋণের মধ্যে কৃষিঋণের অংশ আড়াই শতাংশ থেকে উন্নীত করে চার শতাংশে নিয়ে আসা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই হার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কৃষিঋণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময়ে তা প্রকৃত কৃষকদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা। প্রকৃত কৃষক নন এমন কেউ যদি এই ঋণ পান, তবে সেই টাকা কৃষি খাতের বাইরে অন্য কোথাও ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থপাচারের মতো মারাত্মক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। এ কারণে, কৃষকের নিজস্ব কৃষক কার্ড না থাকলেও, ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি আসলেই একজন প্রকৃত কৃষক।

 

প্রকৃত কৃষকদের ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজতর করার লক্ষ্যে নতুন নীতিমালায় বেশ কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এখন থেকে কৃষকের তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দেওয়া প্রত্যয়নপত্রও গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়া কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে পাস বই থাকার যে বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল, সেটি তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পূর্বানুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও শিথিল করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি, নারী এবং প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের জন্যও নীতিমালায় বিশেষ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি বা জমির দলিলের বদলে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা দলগতভাবে বিকল্প কোনো জামানত গ্রহণ করারও সুযোগ রাখা হয়েছে।

নতুন নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে যে, অঞ্চলভেদে কৃষির ধরনের ভিন্নতা অনুযায়ী ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ‘এরিয়া অ্যাপ্রোচ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের ক্রপ জোনিং, ‘খামারি অ্যাপ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তরের মতো প্রাসঙ্গিক সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি খাতের নতুন সংযোজন হিসেবে উট পালন, হ্যাচারিতে মাছের পোনা ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকে তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে এককভাবে এবং দলবদ্ধ কৃষক বা খামারিদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে কৃষকদের বাঁচাতে কৃষিঋণগ্রহীতাদের বিশেষ বিমা সুবিধার আওতায় আনার একটি প্রস্তাবও নতুন নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যকর করা হবে।

সেই সঙ্গে কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা এবং লিচুর মতো ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণ এবং তা পরিশোধের মেয়াদকাল ফসলের উৎপাদন চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, কৃষি খাতে যদি পর্যাপ্ত ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়, তবে দেশে সামগ্রিকভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, গ্রামাঞ্চলের মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও এটি অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।

সবশেষে ড. হাবিবুর রহমান সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এবারের লক্ষ্য কেবল ঋণের পরিমাণ বাড়ানোই নয়; বরং বিতরণকৃত ঋণের অর্থ সত্যিই উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং তা প্রকৃত কৃষকের হাতেই পৌঁছাচ্ছে কি না, বাংলাদেশ ব্যাংক তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর