advertisement
advertisement

৪০ শতাংশ জনবল ঘাটতি নিয়েই এক মাসে ২ কোটি শিশুকে হামের টিকা প্রদান: ডা. এম এ মুহিত


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ
৪০ শতাংশ জনবল ঘাটতি নিয়েই এক মাসে ২ কোটি শিশুকে হামের টিকা প্রদান: ডা. এম এ মুহিত

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত

advertisement

দেশে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও অন্তত দুই থেকে তিন মাস সময় প্রয়োজন হবে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও রাতারাতি বা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই হামের প্রকোপ একেবারে নির্মূল হয়ে যাবে—এমন কোনো অবাস্তব ও মিথ্যা আশ্বাস তিনি কাউকে দিতে চান না। তার মতে, কোনো দায়িত্বশীল চিকিৎসাবিজ্ঞানী বা চিকিৎসকও এমন অমূলক প্রতিশ্রুতি দেবেন না।

 

বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আয়োজিত শিশুদের হাম বিষয়ক একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এবং গবেষকদের মাঝে অনুদানের চেক প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

 

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, হাম অত্যন্ত মারাত্মক মাত্রায় ছোঁয়াচে একটি রোগ, যা একবার প্রাদুর্ভাব আকারে ছড়িয়ে পড়লে তা সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের এই রোগের হাত থেকে বাঁচাতে কেবল হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা, ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বাড়ানোই কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং রোগটি যেন না হয় সেই প্রতিরোধের দিকেই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। আর কার্যকর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত টিকার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প চিকিৎসাবিজ্ঞানে আবিষ্কৃত হয়নি।

 

বর্তমান পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. মুহিত বলেন, সঠিক সময়ে দেশে টিকা না পৌঁছানো এবং ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারার মতো বেশ কিছু কারণে মূলত আমাদের টিকাদান ব্যবস্থায় একটি বড় শূন্যতা বা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল। আর সেই শূন্যস্থান থেকেই আজকের এই প্রাদুর্ভাবের জন্ম। তাই এখন যেকোনো মূল্যে টিকার কভারেজ বা আওতা বাড়াতে হবে, কারণ 'হার্ড ইমিউনিটি' বা গণরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করাই হলো এই সমস্যা থেকে মুক্তির চূড়ান্ত উপায়।

 

মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতির কথা স্বীকার করে তিনি জানান, বর্তমানে টিকাদান কর্মসূচির জন্য যেখানে ৪০ হাজার মাঠকর্মী প্রয়োজন, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ হাজার জন। অর্থাৎ, প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ জনবল কম রয়েছে। তা সত্ত্বেও এই সীমিত সংখ্যক কর্মীরা তাদের সক্ষমতার ২০০ শতাংশ উজাড় করে দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দুর্গম চরাঞ্চল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে নৌকা কিংবা সাইকেল চালিয়ে তারা বাড়ি বাড়ি টিকা পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের এই অসামান্য ত্যাগের ফলেই মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে একটি বিশাল ও অভূতপূর্ব টিকাদান কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি।

 

স্বাস্থ্যকর্মীদের এই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, "আমাদের মূল সংকটটি হলো লোকবলের। যেখানে ১০ জন চিকিৎসক থাকা দরকার, সেখানে আছেন ৫ জন। এই ঘাটতিগুলো আমাদের দ্রুত পূরণ করতে হবে।"

 

একই সঙ্গে তিনি দেশের বর্তমান এই স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন, কোভিড-১৯ এর মতো ভয়াবহ মহামারি মানুষের জীবনে সচরাচর আসে না। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তন, জীবাণুর ধরন বদল, মানুষের পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের কারণে ভবিষ্যতে মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করাটা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, "বর্তমানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে এক নম্বর অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে 'প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস' বা মহামারি প্রস্তুতিকে। বিশ্বের প্রতিটি দেশকেই এখন তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন করে বিপুল বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো মহামারির মুখে পড়ে আতঙ্কগ্রস্ত হতে না হয় এবং অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঠেকানো যায়।"

 

হাম নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার কাজও সমান্তরালভাবে চলবে বলে জানান তিনি। তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলোর রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে, উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং মৃত্যু কমাতে হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া একটি সমস্যা আগামীকাল বা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই কোনো 'ম্যাজিক বুলেট' দিয়ে ঠিক হয়ে যাবে—এমন অবাস্তব প্রত্যাশা রাখা যাবে না।"

 

সবশেষে, স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরে ডা. এম এ মুহিত বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো মহামারি সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় ও যুগোপযোগী করে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম বিষয়ক এই গবেষণার ফল প্রকাশ এবং গবেষকদের মাঝে অনুদান হস্তান্তরের উদ্যোগকে তিনি সাধুবাদ জানান।

 

তিনি বলেন, "দেশের গবেষকদের সামনে আরও অনেক কাজ পড়ে আছে। আমাদের চমৎকার সব গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোকে আমরা নতুন করে সক্রিয় করছি। আজ শিশু হাসপাতালে গবেষণার এই ফলাফল প্রকাশ এবং গবেষকদের যেভাবে অনুদান প্রদান করা হলো, সেটি আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত ভালো লেগেছে।"

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর