'গোলাপি
মানেই মেয়েদের রঙ, আর নীল হলো ছেলেদের'—সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ধারণার এবার বৈজ্ঞানিক
ভিত্তি খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, লিঙ্গভেদে
রঙের প্রতি এই আকর্ষণের বিষয়টি নিছক কোনো ধারণা নয়, বরং এর পেছনে সত্যিই নারী ও পুরুষের
সুনির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য রয়েছে।
গবেষকরা
মনে করছেন, রঙের এই ভিন্ন পছন্দের নেপথ্যে মূলত মানুষের বিবর্তনগত ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
বিশেষ করে গোলাপি বা লালচে রঙের প্রতি নারীদের যে দুর্বলতা, তা বিবর্তনের পথ ধরেই তৈরি
হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক সময়ে গাছে থাকা পাকা ফলের লালচে রঙ চিনে নেওয়া কিংবা একজন সুস্থ
মানুষের চেহারায় রক্তের স্বাভাবিক লালচে আভা শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই নারীদের
মাঝে এই ধরনের পছন্দের উন্মেষ ঘটতে পারে বলে তাদের ধারণা।
নারী
ও পুরুষের রঙ পছন্দের ভিন্নতা নিয়ে করা প্রথম দিককার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর মধ্যে এটি
একটি। নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী আনিয়া হার্লবার্টের নেতৃত্বে পরিচালিত
এই যুগান্তকারী গবেষণাটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'কারেন্ট বায়োলজি'-তে প্রকাশিত
হয়েছে।
যেভাবে
পরিচালিত হয় গবেষণাটি
গবেষণার
অংশ হিসেবে একদল নারী এবং পুরুষকে একটি অন্ধকার কক্ষে বসানো হয়। এরপর তাদের সামনে কম্পিউটারের
পর্দায় প্রায় ১ হাজার জোড়া বিভিন্ন রঙের আয়তক্ষেত্র দেখানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের বলা
হয়েছিল, তারা যেন প্রতিটি জোড়া থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের সবচেয়ে পছন্দের রঙটি বেছে
নেন।
পরবর্তী
পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচিত রঙগুলোকে রঙের বর্ণালির সাথে মিলিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ
করেন গবেষক দল। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষরা তুলনামূলকভাবে নীল রঙের প্রতি বেশি আকৃষ্ট।
অন্যদিকে, নারীদের প্রথম পছন্দও নীল রঙের দিকে, তবে রঙের বর্ণালিতে গোলাপি এবং লালচে
অংশের দিকে তাদের ঝোঁক অনেকটাই বেশি।
আনিয়া
হার্লবার্ট জানান, নারীদের রঙ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ধরন বা প্রবণতা
লক্ষ্য করা গেছে। তাদের মধ্যে সবুজ এবং হলুদ রঙের প্রতি আকর্ষণ বেশ কম, তবে বেগুনি
থেকে লালচে অংশের দিকে অগ্রসর হলে তাদের পছন্দের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
কেন
এই গোলাপির প্রতি ঝোঁক?
গবেষকদের
মতে, মানুষ হিসেবে জন্মগতভাবেই আমাদের সবার ভেতরে নীল রঙের প্রতি একটি প্রাকৃতিক আকর্ষণ
থাকে। নারীদের ক্ষেত্রে বিবর্তনের ফলে সেই আদি নীল পছন্দের সঙ্গে গোলাপি বা লালচে রঙের
প্রতি বাড়তি ভালোলাগা যুক্ত হয়েছে।
হার্লবার্ট
বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, লালচে এবং নীল রঙের এই পছন্দকে একসাথে মেলালে যে রঙটি
দাঁড়ায়, তা মূলত গোলাপি বা 'লিলাক'-এর কাছাকাছি। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রাচীনকালের মানুষের
জীবনযাত্রা এবং নারী-পুরুষের কাজের ধরনের সাথে এর গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রাচীন সমাজে
পুরুষদের প্রধান কাজ ছিল শিকার করা। শিকারের ক্ষেত্রে রঙের খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝার
চেয়ে, চারপাশের পরিবেশে দ্রুত কোনো গাঢ় বস্তু শনাক্ত করতে পারাটাই বেশি দরকারি ছিল।
বিপরীতে,
নারীরা সাধারণত ফলমূল ও খাবার সংগ্রহের কাজে যুক্ত থাকতেন বলে পাকা ফলের লালচে রঙ চিনতে
পারার ক্ষমতা তাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল। ঠিক একইভাবে, সুস্থ মানুষের শরীরে রক্ত
চলাচলের কারণে চেহারায় যে লালচে আভা ফুটে ওঠে, তা দেখে স্বাস্থ্য বোঝার সংকেত হিসেবেও
এটি কাজে লাগত।
১৯৬০-এর
দশক থেকে খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
ওঠে। তারা মেয়েদের জন্য গোলাপি এবং ছেলেদের জন্য নীল রঙের খেলনা বেশি হারে তৈরি করতে
শুরু করে। ধীরে ধীরে রঙের সঙ্গে লিঙ্গের এই সম্পর্কটি অভিভাবকরাও মেনে নিতে শুরু করেন,
যা একসময় সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ছোটবেলা
থেকেই মেয়ে শিশুদের পোশাক, জুতো ও খেলনায় গোলাপি রঙের আধিক্য তাদের মনস্তাত্ত্বিক পছন্দকেও
প্রভাবিত করতে পারে। শিশুরা চারপাশের পরিবেশ দেখেই সব শেখে এবং অনুকরণ করে। ফলে রঙের
পছন্দের ক্ষেত্রে বাজার, সমাজ এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের এই প্রচলিত ধারণাগুলোও বড় ভূমিকা
রাখে।
গবেষকদের
মতে, মেয়ে শিশুদের বয়স যখন প্রায় দুই বছর হয়, তখন থেকেই তাদের মধ্যে গোলাপি রঙের প্রতি
ঝোঁক বাড়তে থাকে। আবার ঠিক একই বয়সে ছেলেরা এই রঙটি এড়িয়ে চলতে শেখে। সুতরাং, রঙের
পছন্দ কেবল জন্মগত নয়; এর পেছনে সামাজিক পরিবেশের শক্ত প্রভাবও রয়েছে। গোলাপি মূলত
নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রঙ নয়, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এই রঙটি পছন্দ
করতে পারেন।
দীর্ঘদিনের
প্রচলিত ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
'ছেলেরা
নীল এবং মেয়েরা গোলাপি পছন্দ করে'—গবেষকদের প্রাপ্ত এই ফলাফল দীর্ঘদিনের এই পুরনো ধারণাকে
নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এর আগেও নানা গবেষণায় নীল রঙের প্রতি মানুষের একটি সাধারণ
আকর্ষণের কথা জানা গিয়েছিল, কিন্তু নারী-পুরুষের রঙ পছন্দে যে আসলেই পার্থক্য রয়েছে,
তার পক্ষে খুব বেশি শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আগে ছিল না।
হার্লবার্টের
মতে, লালচে রঙের প্রতি নারীদের এই বিশেষ আকর্ষণের পেছনে শুধু সংস্কৃতি বা সামাজিক প্রভাব
দায়ী নয়, বরং মানবজাতির বিবর্তনগত ইতিহাসেরও একটি শক্তিশালী ভূমিকা থাকতে পারে। তবে
রঙের পছন্দের ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রভাব কতটা
গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও পুরোপুরি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। (সূত্র: রয়টার্স)
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।