advertisement
advertisement

গ্যাসের চাপ তলানিতে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় শিল্পমালিকরা


প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | প্রতিবেদক: নিজস্ব সংবাদদাতা প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৬:১১ পূর্বাহ্ণ
গ্যাসের চাপ তলানিতে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় শিল্পমালিকরা

তীব্র গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ। এসব কারখানায় শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে।

advertisement

দেশজুড়ে শিল্প খাতগুলোতে তীব্র গ্যাস-সংকট লেগেই আছে। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কলকারখানাগুলোতে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় বহু কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি কিছু কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে। কেবল নরসিংদী জেলাতেই ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শরও বেশি কারখানা গ্যাস না থাকার কারণে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

 

গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলো, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সারা দেশে প্রতিদিন যেখানে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন, সেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কিন্তু গত শনিবার ভোরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ২৪২ কোটি ঘনফুট। এর পরের দিন রোববার তা আরও কমে ২৪০ কোটি এবং সোমবার ২২৮ কোটি ঘনফুটে এসে দাঁড়ায়। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে সারা দেশে মোট ২২৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।

 

আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গ্যাস-সংকটের কারণে ওই এলাকার ছোট ও বড় মিলিয়ে শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যার ফলে কর্মহীন হয়ে বসে আছেন সাধারণ শ্রমিকরা। কেবল কারখানাই নয়, বাসাবাড়িতেও রান্নার চুলা জ্বলছে না এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনেও গাড়ির লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে।

 

বিভিন্ন কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ যাবত গ্যাসের চাপ একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে তা পুরোপুরি শূন্যেও নেমে আসে। গত কিছুদিন বিকল্প কোনো উপায়ে অন্তত ১০ শতাংশ উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হলেও বর্তমানে বাধ্য হয়েই সব কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। উল্লেখ্য, সারা দেশের দেশীয় কাপড়ের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই পূরণ করে থাকে নরসিংদীর এই বস্ত্রকলগুলো। বর্তমানে এই জেলায় স্পিনিং, টেক্সটাইল এবং ডাইং মিলের মোট সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি।

 

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান আমাদের বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ব্যবসায়ীরা ছোট-বড় তিন শতাধিক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

 

গ্যাস-সংকটে নরসিংদী শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ইয়াসিন সাইজিং মিল, চিশতিয়া সাইজিং মিল, মমিন সাইজিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, হোসেন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, নদী-বাংলা সাইজিং মিল, শিল্পী ডাইং এবং ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস। পাশাপাশি মাধবদী এলাকার পাকিজা গ্রুপ ও আমানত শাহ গ্রুপের একাধিক কারখানা, মুক্তাদিন ডাইং, এমএমকে ডাইং এবং মাধবদী ডাইংসহ আরও বহু কারখানা বর্তমানে বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।

 

নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি এবং মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের কর্ণধার নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া হতাশা ব্যক্ত করে জানান, পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের মাসিক বেতন বা কারখানার গ্যাস বিল—কোনোটিই পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

 

ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া অবিলম্বে এই গ্যাস-সংকট মোকাবিলার তাগিদ দিয়ে বলেন, "এই সমস্যার কবে সমাধান হবে এবং ততদিন পর্যন্ত আমাদের করণীয় কী, তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত।"

 

নরসিংদীতে অবস্থিত আবেদ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন যে, তাদের প্রতিষ্ঠানে গত ২০ দিন যাবত উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। তিনি আমাদের বলেন, শ্রমিকদের মধ্যে যেন কোনো ক্ষোভ বা অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাদের দিয়ে কারখানার যন্ত্রপাতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজ করানো হচ্ছে।

 

এ বিষয়ে নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মাকসুদুর রহমান জানান, "বর্তমানে নরসিংদীতে গ্যাসের প্রেশার বা চাপ একেবারেই নেই। যতটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তার সম্পূর্ণটাই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। যতক্ষণ না পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।"

 

অন্যদিকে, আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গ্যাস না থাকায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর মেসার্স এমএস ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের উৎপাদন কার্যক্রমও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই কারখানার মহাব্যবস্থাপক বাবুল হোসেন আমাদের জানান, গ্যাস লাইনে একেবারেই চাপ নেই, যে কারণে গত কয়েক দিন ধরে তাদের কারখানার সব কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

 

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার কায়েমপুর অঞ্চলে অবস্থিত ফকির নিটওয়্যার কারখানাটি জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে কোনোমতে তাদের উৎপাদন চালু রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক রাজীব আহমেদ জানান, জেনারেটর ব্যবহারের কারণে তাদের প্রতিদিনকার উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

 

রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের কারখানাতেও গতকাল দুপুর থেকে উৎপাদন পুরোপুরি থমকে গেছে। সিটি গ্রুপের কারিগরি পরিচালক সৈয়দ রফিকুর রহমান আমাদের বলেন, "স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে আমাদের ১২০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। অথচ দুপুরের পর এই চাপ ২০ থেকে ২৫-এ নেমে এসেছে। এর ফলে আমাদের সব কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে।"

 

একই অবস্থা বিরাজ করছে গাজীপুরেও। আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ার কারণে জেলার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের গ্যাসনির্ভর ডাইং ও অন্যান্য শাখাগুলোতে কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কোনো কোনো কারখানায় বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে ডাইং সেকশন বন্ধ রাখা হয়েছে।

 

গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় অবস্থিত একটি কারখানার ব্যবস্থাপক আবদুর রহমান জানান, প্রতিনিয়ত গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে কেবল উৎপাদনই কমছে না, বরং নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতাদের হাতে পণ্য তুলে দেওয়া নিয়েও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তারা।

 

গাজীপুর তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক সাইফুজ্জামান সানির সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, "গ্যাসের সরবরাহ চাপ বর্তমানে কিছুটা কমে গেছে। তবে আমরা আশাবাদী যে অতি দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।"

 

সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন করা আছে। এর মধ্যে একটি পরিচালনা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট এবং অন্যটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি। গত ২১ জুলাই একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। টানা ২৫ দিন ধরে চলা ভয়াবহ গ্যাস-সংকটের পর গত শনিবার সামিটের টার্মিনালটি পুরোপুরিভাবে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু করা হলে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তবে নতুন কোনো কার্গো না আসার কারণে গত তিন দিন ধরে এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে সরবরাহ আবারো কমতে শুরু করেছে। জানা গেছে, আগামীকাল ২০ আগস্ট একটি নতুন কার্গো আসার কথা রয়েছে, যা সামিটের টার্মিনালে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও, একটি গোপন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এক্সিলারেট এনার্জির জন্য আগামী ২৩-২৪ আগস্টের মধ্যে আরেকটি কার্গো এসে পৌঁছাতে পারে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর