দীর্ঘ এক মাস পর গত শনিবার থেকে দেশে গ্যাসের
সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সার্বিক সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। বিশেষ করে শিল্পকারখানাগুলোতে
প্রয়োজনীয় চাপের অভাবে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে
গ্যাসের জন্য চালকদের তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বাসাবাড়িতেও
গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্নার কাজে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা।
পেট্রোবাংলার দেওয়া তথ্যমতে, শনিবার সন্ধ্যা
৬টায় দেশে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২৩১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট (দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে
১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৬৮ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট)। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় এটি ৭
কোটি ১০ লাখ ঘনফুট বেড়ে ২৩৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে দাঁড়ায়। তবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা
প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হওয়ায় এখনো ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্টদের মতে,
এক্সিলারেট চালু হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও শিল্প ও সিএনজি খাতে এখনো স্বাভাবিক
অবস্থা ফেরেনি।
গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও শিল্পাঞ্চলে এর কোনো
ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের এসএ স্পিনিং মিলসের অধিকাংশ ইউনিট বন্ধ
রয়েছে। কারখানার ডিজিএম আজিজুল হক জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত
হচ্ছে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে
রয়েছে। তিতাস গ্যাসের গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক সাইফুজ্জামান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, শিল্প
খাতে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।
এদিকে, গ্যাস সংকট ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির
কারণে গত ২২ আগস্ট থেকে ছয় মাসের জন্য কারখানা লে-অফ (বন্ধ) ঘোষণা করেছে পুঁজিবাজারে
তালিকাভুক্ত ফুয়াং ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে
গ্যাস বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্পকারখানায় তাৎক্ষণিক
চাপ পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয়েই হুমকির মুখে পড়েছে।
গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি
পাম্পগুলোতে। উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মিরপুর,
গাবতলী, ডেমরা, মুগদা, খিলগাঁও এবং বনশ্রীর বিভিন্ন স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা
গেছে। মালিবাগের এক সিএনজিচালক ইকবাল হোসেন জানান, দিনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বললেই
চলে; তিনি দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১০০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। অনেক পাম্পে ‘গ্যাস
নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে
দেওয়া হয়েছে, যার ফলে পরিবহন ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও বিশেষ
করে সকাল ও সন্ধ্যায় গ্যাসের চাপ এতই কম থাকছে যে, সাধারণ মানুষের রান্না করতে দীর্ঘ
সময় লেগে যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান সরকার
বা কোনো ব্যক্তি এই সংকটের জন্য দায়ী নন। তিনি এটিকে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক
সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি জানান, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি সারানো
হয়েছে এবং এলএনজি কার্গো আসায় দেশে গ্যাসের চাপ বাড়ছে ও লোডশেডিং কমে আসছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পাওয়ার গ্রিডের
তথ্যে জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১২১ মেগাওয়াট এবং
সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৬৮৫ মেগাওয়াট, ফলে ঘাটতি ছিল ৪৩৬ মেগাওয়াট। অথচ ওই দিন রাত ৮টায়
ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট। দেশীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ায়
লোডশেডিং কিছুটা কমলেও ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে ৫০০-৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়ায়
এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।