অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
কৌশলগত এলাকায় নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০টি বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র বা টেন্ডার
আহ্বানের পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ ও তীব্র
নিন্দা জানিয়েছে কানাডা, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য। বিবিসির এক প্রতিবেদনে
বিষয়টি উঠে এসেছে।
এই পাঁচটি রাষ্ট্র এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে
ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে এই পরিকল্পনা থেকে সরে
আসার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দখলকৃত ফিলিস্তিনি
ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নির্মিত সব বসতিই অবৈধ। বিশ্ব সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপের মুখে জেরুজালেমের
পূর্ব দিকে অবস্থিত ‘ই১’ নামক এলাকার এই বসতি নির্মাণ পরিকল্পনাটি কয়েক দশক ধরেই স্থগিত রেখেছিল
ইসরায়েল।
ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি ইসরায়েলের অনেক মিত্র
দেশেরও দাবি, এই এলাকায় বসতি গড়ে উঠলে বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের’ সম্ভাবনা বড় ধরনের
হোঁচট খাবে। কারণ, এর ফলে পশ্চিম তীর কার্যত দুটি অংশে ভাগ হয়ে যাবে এবং পূর্ব জেরুজালেম
একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
গতকাল প্রকাশিত ওই যৌথ বিবৃতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো
ও কানাডা জানায়, বর্তমান সময়ে যখন পশ্চিম তীরে চরম অস্থিতিশীলতা চলছে, ফিলিস্তিনি অর্থনীতিকে
চরম বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে ফেলা হয়েছে এবং বেসামরিক জনগণের ওপর ইসরায়েলি বসতি
স্থাপনকারীদের নজিরবিহীন সহিংসতা চলছে, তখন এই ধরনের একটি সিদ্ধান্ত চরম উদ্বেগজনক।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই পরিকল্পনা শুধু যে শান্তি থেকে দূরে সরিয়ে দেবে তা
নয়, এর ফলে আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরায়েলের নিজের অবস্থানও আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘের মহাসচিব একটি আলাদা বিবৃতিতে জানিয়েছেন,
ই১ প্রকল্পটি ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য ‘চরম হুমকি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এ বিষয়ে নিজের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর আগে গতকাল যুক্তরাজ্যের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ইসরায়েলের এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানালেও, ইসরায়েলের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা সরাসরি নাকচ করে দেন।
ইতিমধ্যেই বেদুইন ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় এবং
ইসরায়েলি শান্তিকর্মীদের একটি অংশ এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করে আদালতে
চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এর মধ্যেই বুধবার ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয় ই১ এলাকার জন্য
অনুমোদিত মোট ৩ হাজার ৪০১টি আবাসন ইউনিটের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪টির জন্য দরপত্র আহ্বান
করেছে।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি পূর্ব জেরুজালেম
ও ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের মাঝখানে প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠার
কথা রয়েছে।
গত বছরের আগস্টে চরম জাতীয়তাবাদী নেতা ও ইসরায়েলের
বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এই পরিকল্পনাটি জনসমক্ষে উন্মোচন করেন। তখন তিনি
পরিষ্কারভাবেই বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাটি পুরোপুরি ‘মুছে ফেলা
হচ্ছে’।
প্রকল্পটির দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৯
অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এর মাত্র কয়েক দিন পরই, আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে
সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে নির্বাচনের আগে যদি এই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়ে
যায়, তবে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় বসা যেকোনো সরকারের জন্যই তা বাতিল করা কঠিন হয়ে পড়বে।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় পশ্চিম
তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করার পর থেকে ইসরায়েল সেখানে অন্তত ১৬০টি বসতি নির্মাণ
করেছে, যেখানে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বাস করে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, পূর্ব
জেরুজালেম ও গাজাকে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে চায়। এসব বসতির পাশাপাশি
বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনির বাস।
আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও
ইসরায়েলের প্রতিটি সরকারই ধারাবাহিকভাবে এসব বসতি সম্প্রসারণে মদদ জুগিয়ে এসেছে।
২০২২ সালের শেষের দিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডানপন্থী ও বসতিস্থাপনপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ফিরলে এই সম্প্রসারণ
আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা যুদ্ধ চলাকালেও
এই কাজ থামেনি।
ই১ প্রকল্পের বিরোধিতাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে
সতর্ক করে আসছেন যে, এই প্রকল্পটি কার্যকরভাবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ চিরতরে
রুদ্ধ করে দেবে। কারণ এটি পশ্চিম তীরের উত্তর প্রান্তকে দক্ষিণ প্রান্ত থেকে আলাদা
করে ফেলবে এবং রামাল্লাহ, বেথলেহেম ও পূর্ব জেরুজালেমের সংযোগে একটি অখণ্ড ফিলিস্তিনি
নগরাঞ্চল গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত করবে।