স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে যে অসংখ্য প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন রটেছিল, অবশেষে তার জবাব দিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার এক মাস পূর্তিতে একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মাঠে কোনো ধরনের রহস্যজনক বা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি; বরং শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে দলের খেলোয়াড়রা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেছিল।
গত মাসে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ১-০ গোলের ব্যবধানে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের পারফরম্যান্স, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এবং খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। আর এখান থেকেই 'ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের' উদ্ভব হয়। মূলধারার অনেক সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কথা প্রচার হতে থাকে যে, ফাইনালে আর্জেন্টিনা শিবিরের ভেতরে ‘কিছু একটা ঘটেছিল’।
ফাইনাল ম্যাচের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে এএফএ তাদের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে পুরো বিশ্বকাপ আসরে দলের যাত্রার বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের অদম্য লড়াইয়ের প্রশংসা করা হয়। ভিডিওর ধারাভাষ্যে বলা হয়, ‘এক মাস আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল। অনেকেই হয়তো চায়নি যে এটি ঘটুক, তবে শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছে। আর্জেন্টিনা আরও একটি ফাইনালে খেলেছে। যদিও অনেকেই এই সত্যটি এড়িয়ে যেতে চান। আমরা প্রতিটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছি।’
ফাইনালের পর থেকে ছড়ানো ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের বিষয়ে ওই ভিডিওতে এএফএ-এর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘আমাদের বিরুদ্ধে সব রকম অপপ্রচার হওয়া সত্ত্বেও আমরা ঠিকই ফাইনালে পৌঁছেছিলাম। তাই যখন কেউ বলবে যে সেদিন কিছু একটা ঘটেছিল, তখন তাদের শুধু বলবেন, হ্যাঁ। আসলে যা ঘটেছিল তা হলো, জেতার জন্য একটি দল নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে, এক মুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েনি। এর আগে সবকিছু জেতার অভিজ্ঞতা থাকলেও, এবার তাদের হার মানতে হয়েছে।’
ভিডিওটির শেষাংশে ফাইনাল ম্যাচ শেষে রানার্সআপ পদক গ্রহণের সময় দলনেতা লিওনেল মেসির আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার একটি দৃশ্য দেখানো হয়। এরপর নেপথ্যের কণ্ঠস্বর থেকে বলা হয়, ‘অধিনায়কের এই কান্না আমাদের আরও একবার শিখিয়ে দিল যে, আপনি জিততে পারেন কিংবা হারতে পারেন; কিন্তু পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, কখনোই হাল ছাড়া যাবে না।’
এএফএ-এর এই ভিডিও বার্তার পাশাপাশি সরব ভূমিকা পালন করেছেন সংস্থাটির সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে তিনি ফাইনালের পর দলের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগকে ‘নিকৃষ্ট প্রচারণা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তাপিয়ার দাবি, ফাইনালের পর কিছু সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখরা বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা স্বেচ্ছায় ম্যাচটি হেরে গেছেন। তার মতে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল শেষ হওয়ার পর থেকেই দলের বিরুদ্ধে এই পরিকল্পিত অপপ্রচার শুরু হয়।
তাপিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন এই কারণে যে, এক মাস পার হয়ে গেলেও যারা এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়েছিলেন, তারা কেউ নিজেদের ভুল স্বীকার করেননি। তার ভাষায়, এখন পর্যন্ত কেউ প্রকাশ্যে এসে বলেনি, ‘আমাদের ধারণা ভুল ছিল।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফুটবলাররা যখন মাঠের খেলায় নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছিলেন, ঠিক সে সময় বাইরে থেকে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ানো হচ্ছিল। জাতীয় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এমনটা করা হয়েছে বলে তার অভিযোগ। এএফএ সভাপতি মনে করেন, এ ধরনের অভিযোগ মুখ বুজে মেনে নেওয়া অনুচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয় ধামাচাপা পড়ে যাবে, এমন অপেক্ষায় থাকতেও তিনি নারাজ। বিশেষ করে কোনো প্রমাণ ব্যতিরেকে জাতীয় দলের তারকাদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ তোলার বিষয়টি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
তিনি কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়ার মতো এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টিকে আর হালকাভাবে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। যারা এই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন, এখন তাদেরই নিজেদের বক্তব্যের সপক্ষে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
সবশেষে কোচিং স্টাফ, সাপোর্ট স্টাফ এবং দলের খেলোয়াড়দের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তাপিয়া বলেন, যারা মাঠে নেমে নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়াই করেছেন, তাদের কাউকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এখন জবাবদিহি করতে হবে তাদেরই, যারা কোনো প্রমাণ ছাড়াই এমন ডাহা মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়েছে।