হজমজনিত সমস্যার মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য অত্যন্ত
পরিচিত ও সাধারণ একটি নাম। তবে আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাস ও পানীয় গ্রহণের ধরনে
সামান্য বদল আনলে এই অস্বস্তিকর সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে আমাদের
প্রতিবেদককে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। শরীরকে আর্দ্র রাখতে পর্যাপ্ত পানি পানের পাশাপাশি
কিছু সহজলভ্য ফলের রস এবং আঁশ বা ফাইবারযুক্ত পানীয় হজম প্রক্রিয়ায় দারুণ সহায়তা করে।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন যে, শুধুমাত্র পানীয়ের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না;
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি, ফলমূল এবং আঁশজাতীয় খাবার
অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে।
উষ্ণ পানি: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক
গ্লাস কুসুম গরম পানি পানের অভ্যাস শরীরের পানির অভাব দূর করতে সাহায্য করে। শরীরে
পর্যাপ্ত তরলের সরবরাহ থাকলে তা হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখে এবং পেট পরিষ্কার করতে
বড় ভূমিকা পালন করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, পানি যেন অতিরিক্ত গরম না হয়। শুধু সকালেই
নয়, সারা দিন জুড়েই পর্যাপ্ত পানি পানের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
পাকা পেঁপের শরবত: পাকা পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে
পানি ও আঁশ (ফাইবার) থাকে, যা হজমতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত পাকা পেঁপে
খাওয়ার ফলে শরীরে আঁশের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায়
রাখতে সহায়তা করে। চাইলে পাকা পেঁপে দিয়ে শরবত বানিয়েও খাওয়া যেতে পারে। তবে এতে আলাদা
করে চিনি না মেশানোই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। আর শরবতটি ছাঁকনির সাহায্যে না ছেঁকে ফলের
আঁশসহ পান করলে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
কমলার রস: ভিটামিন সি ও পানির দারুণ উৎস হলো
কমলা। তবে কমলার জুস বা রস করে খাওয়ার চেয়ে আস্ত ফল হিসেবে খেলে শরীরে ফাইবারের প্রবেশ
বেশি হয়। তাই কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলে কমলা আস্ত খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। তারপরও যদি রস পান
করতে মন চায়, তবে তাজা কমলার রস ঘরে বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে
চলতে হবে।
পেয়ারার শরবত: সহজলভ্য ফল পেয়ারা ফাইবারের
চমৎকার একটি উৎস। নিয়মিত পেয়ারা খেলে পরিপাকতন্ত্রে আঁশের পরিমাণ বাড়ে, যা হজম ও অন্ত্রের
কাজ সহজ করে দেয়। পেয়ারার শরবত তৈরি করে পান করা গেলেও, সেটি ছেঁকে নিলে এর আঁশগুলো
বাদ পড়ে যায়। তাই শরবত বানালে ফলের পাল্প বা শাঁসসহ পান করাই উত্তম। তবে সবচেয়ে ভালো
উপায় হলো পেয়ারা চিবিয়ে সরাসরি খাওয়া।
লেবু পানি: লেবু পানি সরাসরি কোষ্ঠকাঠিন্যের
কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা নয়, তবে এটি শরীরের তরলের ঘাটতি মেটাতে দারুণ কাজ করে। প্রতিদিনের
পানীয়ের তালিকায় চিনি ছাড়া সামান্য লেবু মেশানো পানি রাখা যেতে পারে। সকালবেলা বা দিনের
যেকোনো সময় এটি পান করা যায়। তবে যাদের গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, লেবু
পানি পানের ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
ইসবগুলের ভুসি মেশানো পানি: কোষ্ঠকাঠিন্য
নিরাময়ে আঁশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত উৎস হলো ইসবগুলের ভুসি। এটি পানির
সংস্পর্শে এলে ফুলে ওঠে এবং অন্ত্রে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, যার ফলে পেট সহজে
পরিষ্কার হয়। ইসবগুল পানের সময় অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত। এটি একবারে
খুব বেশি না খেয়ে পরিমাণমতো খাওয়া ভালো। যদি কাউকে নিয়মিত ইসবগুল খেতে হয়, তবে চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।
ভেজানো চিয়া সিড: চিয়া সিড বা বীজ কিছুক্ষণ
পানিতে ভিজিয়ে রাখলে তা জেলির আকার ধারণ করে। এর মাধ্যমে শরীর একই সঙ্গে তরল ও ফাইবার—দুটিই
পেয়ে থাকে। এক টেবিল চামচ পরিমাণ চিয়া সিড ১০ থেকে ১৫ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রেখে তারপর
পান করা যেতে পারে। তবে হঠাৎ করেই অতিরিক্ত চিয়া সিড গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এর ফলে
কারও কারও পেটে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু
করে সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত।
আদা চা: কুসুম গরম আদা চা পেটের অস্বস্তি
কমিয়ে হজমে স্বস্তি আনতে পারে। বিশেষ করে ভারী কোনো খাবার খাওয়ার পর এক কাপ আদা চা
অনেকের জন্যই বেশ আরামদায়ক একটি পানীয়। আদার মধ্যে থাকা কিছু বিশেষ উপাদান হজম প্রক্রিয়ায়
সরাসরি সহায়তা করে। তবে আদা চায়ে অতিরিক্ত চিনি মেশানো থেকে বিরত থাকা উচিত। সেই সঙ্গে
সারা দিনে মাত্রাতিরিক্ত চা পানের অভ্যাসও পরিহার করা ভালো।
কফি: অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে কফি পানের
পর তাদের পেট পরিষ্কার হওয়ার বা মলত্যাগের প্রবণতা বাড়ে। ধারণা করা হয়, কফি অন্ত্রের
স্বাভাবিক পেশি সঞ্চালনকে বা নড়াচড়াকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। তবে এর মানে এই নয় যে, কোষ্ঠকাঠিন্য
কমানোর জন্য যথেচ্ছ পরিমাণে কফি খেতে হবে। কফি পানের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা
একান্ত জরুরি।
খাবারের দিকেও বিশেষ নজর দিন: কোষ্ঠকাঠিন্য
দূর করতে কেবল একটি নির্দিষ্ট পানীয়ের ওপর ভরসা করলে চলবে না। দৈনন্দিন খাবারের মেন্যুতে
ডাল, ছোলা, শাকসবজি এবং পেঁপে, পেয়ারা, কমলা ও আপেলের মতো আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে।
এর পাশাপাশি হজম প্রক্রিয়া ভালো রাখার জন্য নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা সামান্য হাঁটাহাঁটি
করা দরকার। তবে খাবারে আঁশের পরিমাণ বাড়াতে হলে তা ধীরে ধীরে বাড়ানোই স্বাস্থ্যসম্মত।
দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ডাক্তারের পরামর্শ: মাঝে
মাঝে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিলে শুধু খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই
উপকার মেলে। কিন্তু এই সমস্যা যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তবে কোনোভাবেই অবহেলা করা
ঠিক নয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে যদি পেটে তীব্র অস্বস্তি, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া,
ঘন ঘন বমি হওয়া অথবা হজমের অভ্যাসে বড় ধরনের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়ে, তবে
দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ, এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার নেপথ্যে শরীরের অন্য
কোনো জটিল রোগ বা কারণও লুকিয়ে থাকতে পারে।