নতুন
সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসের তিন মাসই পার হয়ে গেছে শুধু জ্বালানিসংকট সামাল দেওয়ার
চেষ্টায়। সরকার গঠনের দশ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় মার্চ এবং এপ্রিল—এই
দুই মাস কেটেছে কেবল জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে। আর এখন গত এক মাস ধরে সারা দেশে
চলছে ভয়াবহ গ্যাস-সংকট, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরম লোডশেডিং। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের
পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, তার বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর।
জ্বালানি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পুরোপুরি দায় বর্তমান সরকারের নয়। গত দেড় দশক ধরে ধীরে
ধীরে এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। আর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরকারকে বড়
বেকায়দায় ফেলেছে। সম্প্রতি এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও নজরে এসেছে এবং দ্রুত সমাধানের
জন্য তেমন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
জ্বালানি
তেলের সংকট ও সরকারের ব্যবস্থাপনা
গত
মার্চে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে একধরনের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। মাসের প্রথম চার দিনেই দ্বিগুণ
হারে তেল বিক্রি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রেশনিং চালু করলে উল্টো আতঙ্ক বাড়ে
এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। কিছুদিন পর রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও সরবরাহ
আর বাড়ানো হয়নি। সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো হিতে বিপরীত হতে থাকে। টানা দুই মাস ফিলিং
স্টেশনগুলোতে দিন-রাত ভিড় ছিল। এরপর এপ্রিলের শেষ দিকে রেকর্ড পরিমাণ দাম বৃদ্ধি, ফুয়েল
পাস চালু ও সরবরাহ বাড়ানোর পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এই
ঘটনার পর দেশে তেলের মজুত বাড়ানোর কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। এখনো আমদানির ওপরই নির্ভর
করছে জ্বালানি খাত। দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তেল কেনার জন্য বিভিন্ন কোম্পানিকে
কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় কেউ তেল সরবরাহ না করলেও, দ্বিতীয় দফায় আবার তাদেরকেই
সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত হলে দেশে আবারও বড় সংকট দেখা দিতে
পারে।
শোধনাগার
ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিস্থিতি
দেশের
একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল শোধনাগারটি স্বাধীনতার আগের তৈরি। গত আওয়ামী লীগ সরকার
২০১২ সালে ৩০ লাখ টন সক্ষমতার নতুন একটি শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও, তার কাজ
শুরু করেনি। শেষ দিকে এটি এস আলম গ্রুপকে দেওয়া হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল
করে সরকারি খরচে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, যা গত ফেব্রুয়ারিতে উপদেষ্টা পরিষদে
অনুমোদিত হয়। বর্তমান সরকার প্রকল্পটি চালু রাখলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্প পরিচালক
নিয়োগ দেয়নি, ফলে কাজ একেবারেই এগোয়নি।
২০১০
সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’
করেছিল, যা 'দায়মুক্তি আইন' নামে পরিচিত। এই আইনের অধীনে দরপত্র ছাড়া অনেক চুক্তি করা
হয়েছিল। জ্বালানির সংস্থান না করেই বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি
বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৪৫ শতাংশ সক্ষমতা এখন অলস
বসিয়ে রেখে সরকার কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যাচ্ছে, যার কারণে প্রতিবছর
বিদ্যুৎ খাতে সরকারের বিপুল লোকসান হচ্ছে।
বিপুল
বকেয়া ও ভর্তুকি
আওয়ামী
লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল বকেয়ার বোঝা রেখে গেছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক
পটপরিবর্তনের সময় গ্যাস খাতে ৭৫ কোটি ডলার এবং জ্বালানি তেল খাতে প্রায় ৫০ কোটি ডলার
বকেয়া ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ধাপে ধাপে এসব বকেয়া পরিশোধ করে। বর্তমান সরকার নতুন
করে বকেয়া না বাড়ালেও, দুই খাতেই ভর্তুকি বেড়ে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর
থেকে বিপিসি লোকসানে পড়েছে। দেশে তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ হওয়া সত্ত্বেও লোকসান মেটাতে
এক যুগ পর সংস্থাটি সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছে।
পিডিবি
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনলেও নিয়মিত বিল পরিশোধ না করায় বকেয়া বাড়তে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে ৪৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে গিয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটি কমানো হলেও গত আগস্ট থেকে আবার বাড়তে থাকে। বর্তমানে এই
বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
বেসরকারি
খাতে তেল বিক্রির উদ্যোগ
সরকার
জ্বালানি তেল বিক্রির সুযোগ বেসরকারি খাতকে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে শুধু সরকারি
কোম্পানিগুলো তাদের ডিলারদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে। বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে তারা
পরিশোধিত তেল আমদানি করে বাজারে বিক্রি করতে পারবে। তবে বিশেষজ্ঞরা এর বিরোধিতা করছেন।
কারণ, এলপিজির বাজার পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা প্রায়ই নির্ধারিত
দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করে। তাই জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে দিলে বাজার
অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর
বক্তব্য
বিদ্যুৎ,
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আমাদের জানান, ছয় মাসে যেসব
পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল তা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে
দরপত্র আহ্বান, তেল শোধনাগার নির্মাণ এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শুরু
হয়েছে। সরকার জ্বালানিসংকটের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট না
থাকলে হয়তো সরকার আরও ভালো অবস্থানে থাকত।
তিনি
আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মতো কোনো ‘কালাকানুন’ না করে সরকার বিদ্যমান ক্রয় বিধিমালা
মেনেই চুক্তি ও কেনাকাটা করছে। বিশেষ পরিস্থিতির কারণেই দরপত্র ছাড়া কিছু কেনাকাটা
করতে হয়েছে।
গ্যাস
সরবরাহ ও এলএনজি টার্মিনাল
পেট্রোবাংলার
তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছর গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি কমছে। এক দশকের
ব্যবধানে উৎপাদন ১০০ কোটি ঘনফুট কমেছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক উৎপাদন ১৬৩ কোটি ঘনফুট,
অথচ চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
আওয়ামী
লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। মহেশখালীতে বর্তমানে
দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে—সামিট ও এক্সিলারেটের। এ দুটির সক্ষমতা ১১০ কোটি
ঘনফুট। আওয়ামী লীগ সরকার আরও দুটি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও অন্তর্বর্তী সরকার
তা বাতিল করে দেয়। ফলে গত দুই বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল যুক্ত হয়নি।
এর
মধ্যে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে বন্ধ হয়ে যায় এবং গতকাল
বুধবার এলএনজির অভাবে এটি থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু সামিটের
টার্মিনাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। তবে নতুন বিএনপি সরকার দুটি ভাসমান ও স্থলভাগে
একটি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
গ্যাস
অনুসন্ধান ও কূপ খনন
বাংলাদেশে
গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে সফলতার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি হলেও, যথাযথ অনুসন্ধান করা
হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের ১৪ বছর পরও সেখানে তেল-গ্যাস আবিষ্কার হয়নি। গত মে মাসে বর্তমান
সরকার নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেছে, তবে গ্যাস পেতে অন্তত পাঁচ বছর লাগতে পারে।
২০২২
সালে ৫০টি কূপ খননের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে দৈনিক ৬৫ কোটি ঘনফুট
গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। বিএনপি সরকার ১৫০ কূপের কাজে গতি বাড়ানোর কথা
বললেও এ পর্যন্ত মাত্র ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ
পরিকল্পনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
নতুন
সরকার জ্বালানি খাতের পাঁচ বছরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। চলতি বছর ১১৫ কার্গো এলএনজি
আনার পরিকল্পনা রয়েছে। গত জুনে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
তবে
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ জোর দিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে এবং চলতি বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ
উপকরণ আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
লোডশেডিং
ও ইশতেহার
গ্যাস-সংকটের
কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি পাচ্ছে না, যার ফলে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে।
২৮ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ১৪-১৬ হাজার মেগাওয়াট।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সাশ্রয়ী ও দুর্নীতিমুক্ত করার
প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যার কাজ সরকার ধাপে ধাপে এগিয়ে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ
মতামত
সিপিডির
গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আমাদের প্রতিবেদককে বলেন, জ্বালানি খাতের এই
সমস্যা আগের সরকারের রেখে যাওয়া। তবে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা ধীরগতি
ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে সমাধানের উদ্যোগগুলো ভালো হলেও তাৎক্ষণিক
পদক্ষেপে আরও দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণের বিপক্ষে
মত দিয়েছেন, কারণ এতে বাজারের ওপর চাপ বাড়বে।